11:10pm  Saturday, 19 Oct 2019 || 
   
শিরোনাম



কাম না করলে খামু কী
১ মে ২০১৬



রাত বাড়ার সঙ্গে নগরজুড়ে ব্যস্ততা কমে এসেছে মানুষের। কোলাহল কমছে সড়কে, বাস স্টপেজে কমতে শুরু করেছে যানবাহন সহকারীদের উচ্চস্বরে হাঁক-ডাক, যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্নের বিকট আওয়াজও কমছে। সড়কে, সড়কদ্বীপে, আশপাশের দৃষ্টিসীমায় শুধু নিয়নের আলো। রাতের ঢাকার এ নিরবতা ছুঁয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদকেও।

শিক্ষাঙ্গন হওয়ায় এখানে রাতের নিরবতা আসে একটু আগেভাগে। ওই নিরবতা ভেঙে চারুকলার কলপাড় থেকে ভেসে আসছিল হাড়ি-পাতিল ঘষাঘষির শব্দ। কৌতুহল নিয়ে অনুসরণ ভেসে আসা ওই শব্দকে। এগোতেই কলপাড়ে দেখা মিলল এক কিশোরের। বয়স বড়জোর ১২ কিংবা ১৩। কলের পানিতে ঘষছিল হোটেলের রান্নার বড় বড় সব কড়াই। রাত তখন ৯টা ৭ মিনিট।

হাঁটতে হাঁটতে ওই কিশোরের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। শুকনো পাতার মরমর শব্দে আলো-আঁধারির কলপাড়ে কারো উপস্থিতি টের পেল ওই কিশোর। তাকাল পেছনে। অপরিচিত মুখ দেখে কথা বলার আগ্রহ দেখাল না কিশোর। ব্যস্ত হয়ে পড়ল কড়াই ঘষাঘষির কাজে।

কথা বলতে চাইলাম ওই কিশোরের সঙ্গে। জানতে চাইলে বলল তার নাম সুমন। আর ভালো কোনো নাম আছে কি না সে তা জানে না।

হোটেলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ সংশ্লিষ্ট। সেকারণে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সুমনকে হোটেলে আসতে হয়। এরপর সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার পরিবেশনের কাজ চলে টানা বিকেল পর্যন্ত। এর মাঝে সুযোগ করে সুমন সকালের নাশতা আর দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়। বিকেলে সিঙারা, সমুচা, চা বানানোর জন্য তাকে সকালের মত ব্যস্ত হয়ে উঠতে হয়। এরই মাঝে কাজের ছোট-খাটো ভুল-ত্রুটির জন্য ওস্তাদের (দোকান মালিক) গালমন্দ তো আছেই।

সুমন ছাড়াও এই দোকানে আরো ৩/৪জন্য কর্মচারী দিনভিত্তিক কাজ করে। বড় বড় আয়োজনের দিন হোটেলে ভিড় বেড়ে যায়, তাই লোকও বেশি রাখা হয়। তবে হোটেলে যতই লোক রাখা থাকুক না কেন, তাকে প্রতিদিনের রান্নার বড় ডেগজি-হাড়ি-কড়াই ঘষে মেজে ধুতে হয়। গরম ডেগজি-কড়াই চুলা থেকে নামাতে হয়। ফুটন্ত তেলের পাশে তাকে দাঁড়িয়ে খাবারের অনুষঙ্গগুলো ভাজতে হয়। সন্ধ্যার পর হোটেলে ক্রেতার সংখ্যা কমে আসে। তখনও সুমনের ছুটি হয় না। হাড়ি-কড়াই খালি করে তা ধোয়ার জন্য কলপাড়ে ছুটতে হয় তাকে ।

সন্ধ্যার পর থেকে কালিতে ভরে থাকা সব পাত্র ধুয়ে-মুছে ঝকঝক করে তোলে সে। কড়কড়া পাথর ও ডিটারজেন্ট পাউডারের সংস্পর্শে কড়াই মাজার শব্দ তখন আঁধারের নিরবতা ভেঙে জেগে ওঠে।

কিশোর সুমনের সারাদিনের পরিশ্রম আর কষ্টগুলো রাতের এ বাতাস নিয়ে যায় দুর-দুরান্তের অজানা কোথাও। হাড়ি-কড়াই মাজতে মাজতে কপালের সামনের চুলগুলো বারবার সরায় সুমন। হাতের কালি মুখে মিশে আরো আঁধারি হয়ে ওঠে সুমনের মুখ।

সুমন জানে না মে দিবস কিংবা শ্রম দিবস কী? শ্রমের অধিকার কিংবা শ্রমঘণ্টা সম্পর্কে কিছু জানা নেই সুমনের। শ্রম দিবস সম্পর্কে তাকে বুঝিয়ে বলা হয়। তখন সে জানায়, বিষয়টা সে বুঝতে পেরেছে। পরক্ষণই মলিন হয়ে ওঠে কিশোর সুমনের মুখ। পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলে, ‘কাম করলে টাকা পাই। একদিন অসুস্থ হইলে সেদিনের টাকা পাই না। অনেক সময় কাজই পাই না। কালও (১লা মে) দোকানে আসতে হবে। আমাগো বন্ধ নাই। শ্রমিক দিবসেও কাম না করলে খামু কী। আমাগো কাজ আমাগোই করতে হয়।’

সুমনের কথায় প্রশ্ন, অনুযোগ, অভিযোগ সবই স্পষ্ট। প্রতিদিন কত ঘণ্টা সে কাজ করে তা তার জানা নেই। ‘জাইন্ন্যা (জেনে) লাভ নাই। ওস্তাদ (হোটেল মালিক) তো আর বেতন বাড়ায় দিব না। মাঝে মাঝে ব্যাচা-বিক্রু (বেচা-কেনা) ভালো না হইলে প্রতিদিনের ১০০ টাকাও পাই না।’ কাজের ফাঁকে ফাঁকে সুমন নিজে থেকেই প্রতিদিনের কষ্টের কথাগুলো বলতে থাকে।

সুমন আরো জানায়, তার বাবা নেই। সে মায়ের সঙ্গে ঢাকায় থাকে। মা বাড়িতে-বাড়িতে কাজ করে আর সুমন হোটেলে কাজ করে। পেট বাঁচানোর জন্য ভোর থেকে রাত ৮টা কখনো কখনো রাত ৯/১০টা পর্যন্ত তাকে হোটেলে থেকে সব কাজ সেরে বাড়ি ফিরতে হয়। এই সময়ের মধ্যে সুমন যে কতটা ব্যস্ততার মাঝে দিন কাটায় তা সে নিজেও জানে না।

শুধু সুমন নয়, এরকম লাখো শিশু-কিশোরদের জন্য জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ পাস করেছে। সনদের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের নিচে কোনো শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করতে পারবে না।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাসের হেলপার, ওয়েল্ডিং কারখানা, বিড়ি কারখানা, তুলা ও আঁশ জাতীয় শিল্প, কামার শিল্প, রিকশা, ভ্যান, সিএনজি অটোরিকশা, টমটম, নসিমন করিমন চালানো, বাসাবাড়িতে গৃহস্থালির কাজসহ ২৯৫টি ঝুঁকি ও বিপজ্জনক পেশায় নিয়োজিত রয়েছে লাখো শিশু।

এসব কাজে কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটির সুবিধা নেই। অন্যদিকে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের অনেকেই হাত-পা, চোখ হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। আবার কেউ কেউ ধীরে ধীরে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, যক্ষ্মা, ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের শিকার হচ্ছে।

অথচ যে বয়সে তাদের হাতে থাকার কথা কলম, খাতা-বই, সেই হাতে শ্রমের হাতিয়ার নিয়ে তাদেরকে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে। মহান মে দিবস উপলক্ষে সব শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শ্রমের সঠিক মূল্যায়নের পাশাপাশি শিশুশ্রম রোধে সোচ্চার হওয়া জরুরি।
এই নিউজ মোট   3390    বার পড়া হয়েছে


শিশু শ্রম



বিজ্ঞাপন
ওকে নিউজ পরিবার
Shekh MD. Obydul Kabir
Editor
See More » 

প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ মো: ওবাইদুল কবির
ঠিকানা : ১২৪/৭, নিউ কাকরাইল রোড, শান্তিনগর প্লাজা (২য় তলা), শান্তিনগর, ঢাকা-১২১৭।, ফোন : ০১৬১৮১৮৩৬৭৭, ই-মেইল-oknews24bd@gmail.com
Powered by : OK NEWS (PVT) LTD.