12:31pm  Saturday, 30 May 2020 || 
   
শিরোনাম



জঘন্যতম সামাজিক অপরাধ এসিড নিক্ষেপ
১২ আগস্ট ২০১৭, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৪, ১৮ জিলকদ ১৪৩৮



বর্তমান সমাজে সন্ত্রাসের যে মহীরুহ রোপিত হয়েছে তারই একটি শাখা হচ্ছে অতি জঘন্যতম এই সামাজিক অপরাধ এসিড নিক্ষেপ। যদিও এই সন্ত্রাস অন্যান্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেয়েও কিছুটা ভিন্ন। এক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন, স্বীকৃত সন্ত্রাসী, খুনি ও দাগি আসামিরা এর ব্যবহার খুব একটা করে না। মূলত এই সমাজে এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যারা করেন তাদের ভিতর নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অধিক সক্রিয় থাকে বলে অনেকে মনে করেন। যেমন- বর্তমান স্যাটেলাইটের যুগে আমাদের সমাজে পশ্চিমা সংস্কৃতির যে প্রভাব পড়েছে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের প্রচলিত বিশ্বাস, রীতি-নীতি, নারী-পুরুষের আদি সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের সাথে একেবারেই বেমানান। তাই ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অবাধ মেলামেশা ও বিচরণ হেতু একে অপরের সাথে প্রেম বিনিময় ও প্রেম প্রত্যাখ্যান ইত্যাদি সমাজে অধিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেমে প্রত্যাখ্যান ও জৈবিক বাসনা পূরণ না হওয়ায় প্রেমিক, কিশোর ও যুবক শ্রেণী তখন অতি আবেগের বশে এসিড নিক্ষেপের মতো বীভত্স অস্ত্রের আশ্রয় নিয়ে মুহূর্তেই শেষ করে দিচ্ছে তরুণীর স্বপ্ন। অনুরূপভাবে অনেকে মনে করেন, এই বীভত্স এসিড সন্ত্রাস সমাজের চলমান অস্থিরতার, অশিক্ষা, বেকারত্ব, মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, আঞ্চলিক প্রভাব, অর্থের দৌরাত্ম্যসহ নানাবিধ সামাজিক অনাচার ও অবাধ মেলামেশার কারণে আমাদের সমাজে মানবিক মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় হচ্ছে। এর ফলে সার্বিকভাবে এই ধরনের সন্ত্রাসের বিস্তৃতি ঘটছে।

এক্ষেত্রে অন্যান্য অস্ত্রের দুষ্প্রাপ্যতা ও বহনের অসুবিধা হেতু সহজলভ্য, বহনযোগ্য ও ব্যবহারের জটিলতা কম হওয়ার কারণে সমাজে এখন এসিডের ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেইসঙ্গে এসিড নিক্ষেপকারীর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ, তদন্ত কর্মকর্তাদের মাঝে ঘুষ বাণিজ্য, কতিপয় উকিলের অনৈতিকতা, নিম্ন আদালত হতে উচ্চ আদালতে এই ধরনের মামলার দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক প্রভাবে এই ধরনের মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা, এই অপরাধে আসামিদের শাস্তি যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া, নানাবিধ আইনি জটিলতা ও শিথিলতা এই ধরনের সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অধিক দায়ী বলে মনে করি।

বিশেষ করে এসিড নিক্ষেপকারীর বিরুদ্ধে আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঢিলেমির ও আইনি ফাঁক-ফোকরের কারণে অপরাধীদের শাস্তির বাস্তবায়ন তেমন ফলদায়ক হচ্ছে না। তাই এসব সন্ত্রাসী অতি সহজেই আঞ্চলিক প্রভাব, অর্থ, দলীয় বিবেচনায় এবং আইনের ফাঁক- ফোকর দিয়ে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে আসছে। ফলে আইন থাকলেও তা যথাযথ প্রয়োগ ও কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। এরূপ পরিস্থিতিতে আমরা মনে করি, এসিড নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন ও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। কেননা সরকার ও প্রশাসনের একার পক্ষে এ ধরনের অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়, যদি না এর বিরুদ্ধে আমরা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি। আর যদি আমরা এই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হই তবে শারমিনের মতো একদিন আমাদেরও মা-বোনের ওপর ঐসব কাপুরুষোচিতের নিষ্ঠুর, বর্বর ও নির্মম খড়গ নেমে আসতে পারে। তাই এসিড নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে সকলের ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে মামলাগুলো দ্রুত বিচারিক ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা বর্তমানে অধিক জরুরি বলে মনে করি। আমরা আশা করবো, এ ব্যাপারে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

বর্তমানে আমাদের দেশে যারা এসিড নিক্ষেপের শিকার হচ্ছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণী, স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী এবং নিকট আত্মীয় অথবা পূর্ব পরিচিত। এসব তরুণীকে পাড়া বা মহল্লার প্রেমিকধারী বখাটে তরুণ প্রেমের প্রস্তাব দিলে সেক্ষেত্রে তরুণী প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হলেই উক্ত বখাটে এসিডে ঝলসে দিচ্ছে তরুণীর কোমল চেহারাকে। অনেক স্ত্রীকে স্বামী কর্তৃক যৌতুকের কারণে এসিড নিক্ষেপের মতো ভয়াবহ সন্ত্রাসের শিকার হতে হচ্ছে। ফলে মুহূর্তেই বিলীন হচ্ছে তাদের হাজার রঙিন স্বপ্ন ও বিপর্যয়ের কবলে পড়ছে তাদের পরিবার। সমপ্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত ও প্রচারিত রাজধানীর ইডেন কলেজের বাংলা বিভাগের ছাত্রী শারমিন আক্তার আঁখিকে কাপুরুষোচিত প্রেমিক ও তার সহপাঠী মিলে এসিড নিক্ষেপ ও কুপিয়ে নির্মমভাবে জখম করেছে। বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বখাটে কথিত প্রেমিক শারমিনকে প্রথমে কুপিয়ে এবং পরে তার শরীরে এসিড নিক্ষেপ করে নির্মম ও নৃশংর্সভাবে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজী অফিসে নিয়ে গিয়ে জখম করে। এ ধরনের হত্যাকারী নরপিশাচদের আমরা ধিক্কার জানাই। পাশাপাশি খুনি প্রেমিক নামের এই অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও যথাযথ শাস্তি কামনা করি। এ ধরনের অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মধ্য দিয়ে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত হোক জাতি এটাই প্রত্যাশা করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এসিড নিক্ষেপ শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং এটি একটি মানবতাবিরোধী, নিষ্ঠুর, বরর্বতম ও জঘন্যতম অপরাধ। একে যে কোন মূল্যে আমাদের রুখতেই হবে। এক মানুষের বিরুদ্ধে আরেক মানুষের এই ধরনের দুর্বৃত্তপনা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তাই এসিড নিক্ষেপের শিকার ব্যক্তির প্রতি সকলের সমবেদনা প্রদর্শনের পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত ও যথাযথ চিকিত্সা প্রদানের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি এই ধরনের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিষয় নিশ্চিত করাও অনুরূপ জরুরি যে, অপরাধীরা কোনভাবেই পার না পায়। দেশে এসিড যাতে সহজলভ্য একটি পদার্থে পরিণত না হয় সেই ব্যাপারে ক্ষুদ্র এসিড ব্যবসায়ীদের অধিক সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অপরাধীকে তার অপরাধকর্ম থেকে নিবৃত রাখতে উক্ত অপরাধের হাতিয়ার এসিডকে রাখতে হবে তাদের নাগালের বাইরে।

লেখক: মো. আতিকুর রহমানলাইব্রেরিয়ান, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি।
এই নিউজ মোট   5107    বার পড়া হয়েছে


এসিড সন্ত্রাস



বিজ্ঞাপন
ওকে নিউজ পরিবার
Shekh MD. Obydul Kabir
Editor
See More » 

প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ মো: ওবাইদুল কবির
ঠিকানা : ১২৪/৭, নিউ কাকরাইল রোড, শান্তিনগর প্লাজা (২য় তলা), শান্তিনগর, ঢাকা-১২১৭।, ফোন : ০১৬১৮১৮৩৬৭৭, ই-মেইল-oknews24bd@gmail.com
Powered by : OK NEWS (PVT) LTD.