02:23pm  Monday, 22 Apr 2019 || 
   
শিরোনাম



মাগুরা গ্রামের সেই শান্তিলতা ঘোষকে সংবর্ধনা দিলেন
৪ এপ্রিল ২০১৯, ২০ চৈত্র ১৪২৫, ২৬ রজব ১৪৪০



একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যশোরের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ অবদান রাখায় যশোরের অভয়নগর উপজেলার মাগুরা গ্রামের সেই শান্তিলতা ঘোষকে সংবর্ধনা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যশোরে পৌঁছান শিক্ষামন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. দীপু মনি বলেন, 'সর্বস্বত্যাগী শান্তিলতা ঘোষ। শিক্ষা বিস্তারের স্বার্থে তার সমুদয় সম্পত্তি দান করেছেন যশোরের অভয়নগর উপজেলার মাগুরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে। দিনহীন অবস্থায় বসবাস করলেও অশীতিপর এ শিক্ষানুরাগী নিয়মিত খোঁজ নেন তার বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের– লেখাপড়া ঠিকমতো হচ্ছে কি-না। এ রকম এক মানুষকে সম্মান জানাতে আসতে পেরে আমি আনন্দিত।'

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, 'তিনি (শান্তিলতা) নিজে কিছু পাওয়ার জন্য দান করেননি। সমাজের উপকারের কথা ভেবে দান করেছেন। এখন এই সমাজের কিছু দায়িত্ব রয়েছে শান্তিলতার জন্য। আমাদের তা পালন করতে হবে। আমি মনে করি, এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তারা শান্তিলতার জন্য কিছু করবেন।'

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহসভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, মাগুরা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বাবু তারাপদ দাস, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির যশোরের সভাপতি হারুন-অর-রশিদ, সাধারণ সম্পাদক সাজেদ রহমান, অভয়নগরের প্রেমবাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রভাষক মফিজ উদ্দিন, যশোর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোলাম আযম প্রমুখ।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে শান্তিলতার হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দেওয়া হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানে শান্তিলতাকে ক্রেস্ট, মানপত্র, শাড়ি ও উত্তরীয় প্রদান করা হয়।

শান্তিলতা ঘোষ ১৯৩১ সালের ১২ ডিসেম্বরে অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের মাগুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইন্দুভূষণ বিশ্বাস ও মা সুমনা বিশ্বাস। তিন ভাই-বোনের মধ্যে শান্তিলতা ঘোষ প্রথম সন্তান। কিশোরী বয়সেই তিনি তার দুই ভাইকে হারান। পিতা ইন্দুভূষণ বিশ্বাস একজন সংস্কৃতিমনস্ক মধ্যবিত্ত কৃষক ছিলেন। তিনি গ্রামে পালাগান, যাত্রাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। গ্রামের যেসব ছাত্র অর্থাভাবে লেখাপড়া করতে পারতো না তাদের সাহায্য করতেন। এহেন সমাজসেবক সংস্কৃতিমনা শিক্ষানুরাগী ইন্দুভূষণ বিশ্বাস মাগুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য নিঃশর্তে ৩৩ শতক ও বাজার স্থাপনের জন্য ৫০ শতক জমি দান করেন। শিক্ষামন্ত্রী অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের নামটি শান্তিলতার পিতা ইন্দুভূষণের নামে করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।

শান্তিলতা ছোটবেলায় গ্রামের পাঠশালায় লেখাপড়া শুরু করলেও মাত্র ১৪ বছর বয়সে যশোর কোতয়ালী থানার বসুন্দিয়া ইউনিয়নে জগন্নাথপুর গ্রামের বিদ্যুৎ ঘোষের সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের চার বছরের মাথায় তিনি একটি ছেলে সন্তানের জননী হন। কিন্তু জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই সন্তানের মৃত্যু হয়। বিয়ের ১০ বছর পর তার স্বামী কলেরায় আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। এরপর সন্তানহীন বিধবা শান্তিলতার প্রতি শ্বশুরবাড়ির লোকদের আচরণ রূঢ় হতে থাকলে একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ফিরে যান পিত্রালয়ে। তার কিছুদিন পর বাবা ইন্দুভূষণও মৃত্যুবরণ করেন।

অভিভাবকহীন হয়ে শান্তিলতা ঘোষ বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির ওপর ভর করে জীবন নির্বাহ করতে থাকেন। একাকিত্ব কাটানোর জন্য প্রতিবেশী সুনীল দের ২১ দিনের সন্তান গৌতম দেকে দত্তক নেন। এরই মাঝে গ্রামের লোকজন এলাকার সন্তানদের লেখাপড়ার উন্নয়নের জন্য একটি মাধ্যামিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারা শান্তিলতার কাছে জমি চাইলে বাবার আদর্শ অনুসরণ করে তিনি তার সমুদয় জমি (৬ দশমিক ৮৬ একর) মাগুরা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামে লিখে দেন। তখন তার আবেদন ছিল স্কুলটি তার বাবা ইন্দুভূষণ বিশ্বাসের নামে করা হোক। কিন্তু স্থানীয় উদ্যোক্তারা গ্রামের নামেই স্কুলটি স্থাপন করেন।

সময়ের পরিক্রমায় পালিত পুত্র গৌতমের বিয়ে দেন এবং তার সন্তান-সন্তানাদি হয়। একটি জীর্ণ কুঠিরে তাদের কষ্টকর বসবাস। এ অবস্থার মাঝেও শান্তিলতা ঘোষ নিয়মিত ছুটে যান বিদ্যালয়ে; ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া ঠিকমতো হচ্ছে কি-না সেই খোঁজখবর নিতে।

এরই মাঝে ২০১৭ সালে তার জীর্ণ মাটির ঘরে বাসা বাঁধে বিষধর সাপ। এ সংবাদে তৎকালীন অভয়নগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মনদীপ ঘরাই ছুটে আসেন সরজমিনে দেখতে। তখনই বোঝা যায়, শান্তিলতা ঘোষের নিজস্ব কোনো জমিই অবশিষ্ট নেই; সব দান করা বিদ্যালয়ের নামে। তাই ঘর সংস্কার করা বা নতুন করে স্থাপনের জায়গা কোথায়? তখন মনদীপ ঘরাইয়ের মধ্যস্থতায় স্কুল কর্তৃপক্ষ, ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ একমত হয়ে বিদ্যালয়ের নামে দান করা জমি থেকে ১ দশমিক ৪৯ শতক জমি গৃহনির্মাণের জন্য শান্তিলতাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। একইসঙ্গে উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে সরকারি অনুদানসহ উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তির সহায়তায় একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়।

শান্তিলতার স্নেহময়ী ব্যবহারে তিনি এলাকার সকলের শ্রদ্ধেয়া। কিছু না চাইলেও স্থানীয়রা তাকে কাপড়, খাদ্য ও চিকিৎসায় সহযোগিতা করেন। তিনি বয়স্কভাতা মাসিক মাত্র পাঁচশ’ টাকা সরকারি অনুদান পান। এই মহৎ হৃদয়ের মানুষটির দরিদ্রতা নিয়ে যেমন অভিযোগ নেই, তেমনি তিনি সবসময়ই অন্যের কল্যাণ কামনায় ব্যস্ত থাকেন। জীবন সায়াহ্নে এসে শান্তিলতা ঘোষের একমাত্র চাওয়া— বাবা ইন্দুভূষণ বিশ্বাসের নামে অন্তত বিদ্যালয়ের একটা ভবন করা হোক।


এই নিউজ মোট   5580    বার পড়া হয়েছে


সফলতার গল্প



বিজ্ঞাপন
ওকে নিউজ পরিবার
Shekh MD. Obydul Kabir
Editor
See More » 

প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ মো: ওবাইদুল কবির
ঠিকানা : ১২৪/৭, নিউ কাকরাইল রোড, শান্তিনগর প্লাজা (২য় তলা), শান্তিনগর, ঢাকা-১২১৭।, ফোন : ০১৬১৮১৮৩৬৭৭, ই-মেইল-oknews24bd@gmail.com
Powered by : OK NEWS (PVT) LTD.