02:37pm  Monday, 22 Apr 2019 || 
   
শিরোনাম



নেত্রকোনার হাওরা লে ধানে চিটা, কৃষক দিশেহারা
১০ এপ্রিল ২০১৯, ২৭ চৈত্র ১৪২৫, ৩ শাবান ১৪৪০



নেত্রকোনা : ধান উদ্ধৃত্ত জেলা হিসেবে পরিচিত নেত্রকোনার হাওরা লে এবার বোরো ধানে চিটা দেখা  দিয়েছে। এতে করে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষকের মূখে হাসির বদলে কান্না দেখা দিয়েছে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৫টি হাওর উপজেলাসহ ১০টি উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষমাত্রা  নির্ধারণ করা হয়  ১ লাখ ৮০ হাজার ৯শত ৫২ হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬ শত হেক্টর জমি। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৮শত হেক্টর জমিতে হাইব্রীড, ১ লক্ষ ৬০ হাজার ৪ শত ৮০  হেক্টরে উচ্চ ফলনশীল ও ৩ শত ২০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। চাল হিসাবে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ লাখ ২৫ হাজার ৮শত ২১ টন।


হাওরা লে বছরের ৭/৮ মাস পানি থাকায় তাদের একমাত্র ফসল হচ্ছে বোরো। এ সফল ঘরে তুলে তারা সারা বছর পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে জীবনযাপন করে আসছে। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি বিয়ে সাদিও এ ফসলের ওপর নির্ভরশীল। বোরো ধানের চারা তর তর করে বেড়ে উঠায় কৃষকের চোখে মুখে হাসির ঝিলিক দেখা দেয়। সবুজ ধানের শীষে বাতাসের দোল খাওয়ার সাথে সাথে তাদের নানা ধরনের স্বপ্নও দোল খেতে শুরু করে। আগামীর স্বপ্নে কৃষকরা বিভোর হয়ে পড়ে। সবুজ ধান সোনালী বর্ণ ধারণ করার পর (ব্রি আর-২৮) ধানে চিটা দেখা দেয়ায় তাদের সেই স্বপ্ন অনেকটাই ফিকে হয়ে পড়তে শুরু করেছে। মাত্র কয়েকদিন আগেও যে কৃষক সোনার ফসল ঘরে তোলার স্বপ্নে আনন্দে উদ্বেলিত ছিলেন, আজ তাদের চোখে মুখে চরম হতাশার চাপ।


প্রতিবছর চৈত্রের শেষ দিকে হাওরা লে বোরো ধান কাটা শুরু হয়। হাওরা লের কৃষকরা প্রতি বছর প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়া ও আগাম বন্যার ঝুঁকিতে থাকেন। পাহাড়ি ঢল, অতি বৃষ্টিতে প্রায় প্রতি বছর আগাম বন্যায় তলিয়ে যায় কৃষকের সোনালী ফসল। এ বছর হাওরা লে পাহাড়ী ঢল ও আগাম বন্যা দেখা না দিলেও ধানে চিটা দেখা দেয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।


মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপুতা, শনির হাওর, তেতুলিয়া, গাগলাজুর, সুয়াইর, বরান্তর, হাটনাইয়া, আদর্শনগর, খালিয়াজুরী উপজেলার চাকুয়া, জগন্নাথপুর, পাংগাসিয়া, কির্তনখোলা, কটিচাপরা, সেনের বিল, জালর বন, সোনাতোলা, বল্লীর চৌতরা, জগন্নাথপুরের বড় হাওর, বাজোয়াইল, পাঁচহাট, নগর, বোয়ালী, মদন উপজেলার মাঘান, গোবিন্দশ্রী, কদমশ্রী, গনেশের হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে ধানে ব্যাপক চিটা দেখা দিয়েছে।

 

খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের কৃষক হারুন অর রশিদ বলেন, ৩০ একর জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। এর মধ্যে ২৩ একর জমিতে চিটা দেখা দিয়েছে। বল্লী গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া জানান, তার ১৫ একর জমির ১৩ একর জমিতেই চিটা ধান হয়েছে। গছিখাইরে শফিকুলের ১৫ একরের মধ্যে ১০ একর চিটায় আক্রান্ত হয়েছে।

মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওরে বরান্তর গ্রামের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, আমি ১৫ একর জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। প্রতি কাটায় যেখানে ৬-৭ মন ধান পেতাম, এবার প্রতি কাটায় একমন ধান পাব কিনা সন্দেহ। হাটনাইয়া গ্রামের কৃষক মজিদ মিয়া বলেন, আমি মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দার দেনা করে ১০ একর জমি করেছি। সব জমিতেই চিটা দেখা দেয়ায় কিভাবে দার দেনা সুদ করবো, ভেবে পাচ্ছি না। খুরশিমুল গ্রামের কৃষক জামাল মিয়া কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমার সবকিছুই শেষ হয়ে গেছে। কিভাবে সংসারের সারা বছরের খাবার যোগাড় করবো।

 

নেত্রকোনা জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আনিসুর রহমান বলেন, হাওরে বোরো ধানে ব্যাপক চিটা হওয়াতে কৃষকরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষকরা যতটুকু ধান উঠাতে পারছেন, তার যেন ন্যায্যমূল্য পায় সেদিকে সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে। এনজিওগুলো ও মহাজনরা যাতে কৃষকের উপর সুদের জন্য অত্যাচার নির্যাতন চালাতে না পারে সেই দিকেও স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বিশেষ খেলায় রাখাতে হবে।

এদিকে ধানে চিটা হবার কারণ নির্ণয়ের জন্য গাজীপুর কৃষি গবেষণা ইনিষ্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহম্মদ আশিক, উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হীরেন্দ্র নাথ বর্মন, উদ্ভিদ রোগতত্ব বিভাগের অফিসার ড. তুহিনা খাতুন জেলার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী এবং মদন উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকার আক্রান্ত বোরো জমি পরিদর্শণ করে কৃষকদের সাথে কথা বলেন। এ ব্যাপারে তারা কৃষকদের কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন। কর্মকর্তারা অভিমত দেন যে, ২৯ জানুয়ারী থেকে ৩১ জানুয়ারী পর্যন্ত রাতে তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে এবং দিনে ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে থাকায় বীজ তলা তৈরী ও চারা রোপন কালে বোরো ধানের চারা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়। ফলে ধানে চিটা দেখা দিয়েছে।

 

নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-রিচালক মো. হাবিবুর রহমান হাওরা লে বোরো ধানে চিটা দেখা দেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দায় হাওরা লের প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে জানানো হয়েছে।

 
খলিলুর রহমান শেখ
নেত্রকোনা

এই নিউজ মোট   708    বার পড়া হয়েছে


কৃষি



বিজ্ঞাপন
ওকে নিউজ পরিবার
Shekh MD. Obydul Kabir
Editor
See More » 

প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ মো: ওবাইদুল কবির
ঠিকানা : ১২৪/৭, নিউ কাকরাইল রোড, শান্তিনগর প্লাজা (২য় তলা), শান্তিনগর, ঢাকা-১২১৭।, ফোন : ০১৬১৮১৮৩৬৭৭, ই-মেইল-oknews24bd@gmail.com
Powered by : OK NEWS (PVT) LTD.