05:12pm  Tuesday, 22 Oct 2019 || 
   
শিরোনাম
 »  সৌদির ধরপাকড়ে বিপাকে প্রবাসীরা, আরও ৭০ বাংলাদেশিকে ফির‌তে হ‌য়ে‌ছে     »  মা কে বিয়ে করায় সৎ বাবাকে তুলেই নিয়ে গেল ছেলে     »  পঞ্চগড়ে গলির রাস্তায় পাওয়া সেই কন্যাশিশুটির মাকে ঠাকুরগাঁওয়ে পাওয়া গেছে     »  বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার কোন বিকল্প নেই     »  বোরহানউদ্দিনের সেই বিপ্লবসহ তিনজন কারাগারে     »  ভোলাহাট থানায় চলমান সকল সমস্যা নিয়ে আলোচনা     »  ঝালকাঠিতে নবাগত অতিঃ পুলিশ সুপারকে জেলা পুলিশের ফুলেল শুভেচ্ছা     »  শাহজালালে ২৯৯ যাত্রী নিয়ে সৌদি বিমানের জরুরি অবতরণ     »  খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি মিলেছে      »  মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি গঠনে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ছাত্রলীগের    



গারো জাতির সংস্কৃতি, সৌন্দর্য, শক্তি ও বৈচিত্র্য
০৯ জুলাই ২০১৯, ২৫ আষাঢ় ১৪২৬, ০৫ জিলকদ ১৪৪০



গারো সমাজ অতি প্রচীন সভ্য-সমাজ। তার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ধারা প্রবাহিত হয়েছে যুগে যুগে। বহু পথ পরিক্রমায় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার সংস্কৃতির যেমন পরিবর্তন ঘটেছে তেমনি পোষাক-পরিচ্ছদ, অলংকার ও যুদ্ধ অস্ত্রেরও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আজকাল অনেক পোষাক ব্যবহার করতে পারে না শহুরে জীবনে। কর্মক্ষেত্রে নানা প্রতিকুলতার জন্য পোষাক ব্যবহারে অনীহা দেখা যায়। গারো অলংকারও আগের মতো বন-পাহাড়-ঝরনা কেন্দ্রিক জীবনের মতো ব্যবহৃত হয় না। সমতলবাসীর সঙ্গে মিলে মিশে বৃহত্তর সমাজের অনুকরণে অলংকারাদি ব্যবহার করছে। যুদ্ধঅস্ত্র এখন অনেকটা বাৎসরিক উৎসবাদিতে ব্যবহার হয়। বনের পশু শিকার যেমন নেই তেমনি নিরাপত্তার জন্য এইসব ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। গারো সংস্কৃতির এই মূল্যবান উপকরণ ও উপাদানগুলো সংরক্ষণ করা গেলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি যেমন সমৃদ্ধ হতো তেমনি গারো সম্প্রদায় নিজের সংস্কৃতি চর্চা ও সংরক্ষণে স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করতো।ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা ও আনন্দমুখর পরিবেশে শুক্রবার রাজধানীতে উদযাপিত হয়েছে গারো সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক অনুষ্ঠান ‘ ওয়ানগালা’। নগরীর ফার্মগেটের বটমূলী হোম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত উৎসবে আট সহশ্রারাধিক গারো নর-নারীর সমাগম ঘটে। শিশুদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। শহুরে জীবনের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে দিনভর তারা নিজেদের মতো করে আনন্দে মেতে থাকে। স্কুল মাঠে গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী স্টল। ওই সব স্টলে স্থান পায় গারো সংস্কৃতি ও আবেগবিজড়িত পোশাক, খাবার, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ধরণের পণ্য। খাবারের দোকানে ঘুরে ঘুরে স্বাদ নেয় নিজেদের ঐতিহ্যবাহী নানা পদের খাবারের। কেউ কেউ বাসায় খাবার জন্য কিনে নেন জুমের আলু, কুমড়া, শামুক, কাঁকড়াসহ নিজেদের সংস্কৃতির বিভিন্ন পণ্য। দিনব্যাপী পূজা-অর্চনা, আলোচনা, নাচ-গানে এই উৎসবটি পালন করেছে রাজধানীতে বসবাসরত গারো সম্প্রদায়।
গারোদের ওয়ানগালা উৎসব

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ানগালা উৎসবে আগত প্রায় সব নারীর শরীরে গারো সংস্কৃতির ছাপ। গারো পোশাক নকমান্দা ও টি শার্ট পরে স্কুল প্রাঙ্গণের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মঞ্চে চলছে গারো নাচ ও গান। মনের অজান্তেই নিজেদের সংস্কৃতির অতি পরিচিত গানের তালে তালে নাচতে কেউ কেউ। বছরে একদিন এমন পোশাক পরার এবং সকলের সঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুযোগ পায় তারা। শুক্রবার ঢাকায় বসবাসরত সব বয়সের কয়েক হাজার গারো আদিবাসী করে তাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উৎসব ‘ওয়ানগালা’। ঢাকা ওয়ানগালার বিদায়ী নকমা (সমাজ প্রধান) পবিত্র মান্দা জানান, ওয়ানগালা’ ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উৎসব। আদিবাসী গারোদের বিশ্বাস, শস্য দেবতা বা ‘মিশি সালজং’ পৃথিবীতে প্রথম ফসল দিয়েছিলেন এবং তিনি সারা বছর পরিমাণ মতো আলো-বাতাস, রোদ-বৃষ্টি দিয়ে ভালো শস্য ফলাতে সহায়তা করেন। তাই নবান্নে নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় ‘মিশি সালজং’কে ধন্যবাদ জানাতে উৎসবের আয়োজন করে গারোরা। ফসল দেবতাকে উৎসর্গ না করে তারা কোন খাদ্য ভোগ করে না। ‘ওয়ানগালা’ আদিবাসী মান্দি বা গারোদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। দেড় এক যুগ ধরে প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় বসবাসরত গারোরা এ উৎসব আয়োজন করছে। যুগ যুগ ধরে গারোরা তাদের শস্য দেবতাকে এই ফসল উৎসর্গ করে আসছে। খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর গারোদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রথাটি এখন ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে একত্রে করে পালন করা হয়। অর্থাৎ এক সময় তারা তাদের শস্য দেবতা মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করলেও এখন তারা নতুন ফসল কেটে যিশু খ্রিষ্ট বা ঈশ্বরকে উৎসর্গ করে এই উৎসব পালন করে। এ সময় সামাজিক নানা আয়োজনসহ ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠানাদিও পালন করা হয় বলে জানান পবিত্র মান্দা।

শুক্রবার সকালে দেবতাদের পূজার মাধ্যমে শুরু হয় ‘ওয়ানগালা উৎসব ’। ‘আমুয়া’, ‘রুগালা’র মতো ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। দুপুরের বিরতির পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে নিজস্ব ভাষায় গান গেয়ে শোনান গারো শিল্পীরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল গারোদের ঐতিহ্যবাহী জুম নাচ। উৎসবে উপস্থিত গারারো জানায়, ওয়ানগালা একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। ওয়ানগালা উৎসব পাহাড়ি জুমচাষকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হয়ে থাকে। নতুন ফসল তোলার পরে নকমা (গ্রাম প্রধান) সবার সঙ্গে আলোচনা করে অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করেন। ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে দেখা গেছে, নতুন ধানের চালের গুঁড়া পানিতে মিশিয়ে শস্য, বাড়ি ও মানুষের কপালে বা শরীরে ছাপ দেয়া হয়। ধূপ পুড়িয়ে, দামা বাজিয়ে রাজকীয় বেশে ‘নকমা’ বা সমাজ প্রধান ও ‘খামাল’ বা পুরোহিত নৃত্য করতে করতে গান গাইতে গাইতে দল বেঁধে রাজ্যের প্রজাদের নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ‘দু’ বা মুরগি এবং ‘চু’ বা মদ দিয়ে তাততারা রাবুকা বা বাঁশ দিয়ে বানানো প্রতিমা রাক্কাসীর প্রতি ধন্যবাদ জানান। আর পিছে থাকে কালো বা লম্বা বাঁশ দিয়ে বানানো বাঁশি, দামা বা লম্বা ঢোল, বোম বা মহিষের শিং দিয়ে বানানো বাঁশি নিয়ে রাজ্যের সাধারণ গারোরা। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জুম ওয়ানগালা আজ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি গারোদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার এক অনবদ্য আন্দোলন বলে দাবি করেছে উপস্থিত গারোরা।

প্রথাগত গারো আইনের লেখক রেভা: সি.ডি. বলডুইন এবং মি. জবাং ডি. মারাক উভয় লেখকের বইগুলো পড়লে এবং নিখুঁতভাবে আলোচনা করলে বুঝা যাবে যে, গত ৮০/৯০ বছরের ব্যবধানে তাদের লিখিত গারো উত্তরাধিকার আইনের অনেকখানি পরিবর্তন ও শিখিল হয়ে গেছে। গারো সমাজে এ সমস্ত পরিবর্তনগুলো এসেছে প্রথমত, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া; দ্বিতীয়ত, বিশ্বায়ন ও আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব তৃতীয়ত, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা, চতুর্থত, সরকারি/বেসরকারির বিভিন্ন সংস্থায় চাকুরি করে আত্মনির্ভরশীল হওয়া; পঞ্চমত, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির প্রসার ও উন্নয়নের কারণে এ সমস্ত পরিবর্তন ও শিথিলতাগুলো এসেছে। তথাপি বাংলাদেশে গারো এবং খাসিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার আইন এখনো বলবৎ রয়েছে। তবে একথা ঠিক যে, গারো মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার আইন কিংবা হিন্দু পিতৃতান্ত্রিক আইন বলে, কোনো উত্তরাধিকার আইডন, বর্তমান প্রচলিত মানবাধিকার আইনের পক্ষে নয়। গারো মাতৃতান্ত্রিক আইন গারো পুরুষদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছে। আবার হিন্দু পিতৃতান্ত্রিক আইন হিন্দু মহিলাদের সম্পদ-সম্পত্তি থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত রেখেছে। দু’টোই মানবতা বিরোধী মৌলবাদী আইন। পরিবর্তনশীল সমাজে এই আইনগুলো সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। নিম্নে প্রথাগত গারো আইনের কতগুলো ধারা সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ করা হলো। যথা: কোনো গারো পুরুষ পারিবারিক/মাতৃসম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। একজন গারো যুবক পুরুষ বিবাহের পূর্বে মাতৃগৃহে থাকাকালীন অবস্থায় যা কিছু বিষয় সম্পত্তি আয় উপার্জন করবে তা সমস্তই তার মাতৃসম্পত্তি রূপে পরিগণিত হবে। অনুরূপভাবে একজন গারো পুরুষ বিবাহ পরবর্তী জীবনে স্ত্রী গৃহে থাকা অবস্থায় যে সমস্ত বিষয় সম্পত্তি আয় উপার্জন করবে তা সমস্তই তার স্ত্রীর সম্পত্তি হিসাবে গণ্য হবে এবং স্ত্রীর মৃত্যু হলে উক্ত সম্পত্তি স্বামীর না হয়ে স্ত্রীর কন্যা/কন্যাদের হবে। কোনো গারো পুরুষ, স্ত্রী অথবা স্ত্রীর অবর্তমানে বয়স্কা কন্যাদের অনুমতি ছাড়া দান, বিক্রয়, কিংবা যেকোনো উপায়ে পরিবারের সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবে না। তবে স্বামী বৈধ প্রয়োজনে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবে যদি পরিবার থেকে কোনো প্রকার আপত্তি না থাকে। গারো পারিবারিক সম্পত্তি কোনো অবস্থাতেই বিভাজন বা বিভক্ত করা যাবে না। মা পুত্র সন্তানকে দয়াবশতঃ যদি কোনো স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি দান করে থাকেন, ওই পুত্র কেবল তার জীবদ্দশাতেই ভোগ দখল করতে পারবে। মায়ের আগে পুত্র সন্তান মারা গেলে মায়ের দেয়া সম্পত্তি মাতৃগৃহেই প্রত্যাবর্তিত হবে। গারো পুরুষ প্রথম স্ত্রীর এবং তার চ্রাদের (মাতৃ গোত্রের পুরুষ লোকগণ) সম্মতি নিয়ে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবে। তবে কোনো অবস্থাতেই দ্বিতীয় স্ত্রীর কন্যা ‘নকনা’ (উত্তরাধিকারী কন্যা) নির্বাচিত হতে পারবে না। তবে প্রথম স্ত্রী যদি বন্ধ্যা হয়ে থাকে এবং দ্বিতীয় স্ত্রী যদি প্রথম স্ত্রীর মাহারিভুক্ত হন, তখন দ্বিতীয় স্ত্রীর কন্যা সন্তান ‘নকনা’হতে পারবে। যদি কোনো গারো স্ত্রী স্বামীকে পরিত্যাগ করে গৃহত্যাগী হয়ে অন্য পুরুষের ঘর করে, তখন ওই স্ত্রী নিজ সম্পত্তি থেকে অধিকার হারাবে। এ ক্ষেত্রে গৃহত্যাগী স্ত্রীর নাবালিকা কন্যা সন্তান থাকলে উক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে এবং পিতা অভিভাবক হিসাবে ওই গৃহে অবস্থান করবে। গৃহত্যাগী স্ত্রীর চ্রাগণ যদি স্বামীর জন্য দ্বিতীয় স্ত্রী প্রদান করে তবে ওই সম্পত্তি দ্বিতীয় স্ত্রী অথবা তার মেয়ে প্রথম স্ত্রীর মেয়ের সঙ্গে অংশীদার হয়ে ভোগ দখল করবে। প্রথম স্ত্রীর কোনো কন্যা সন্তান না থাকলে দ্বিতীয় স্ত্রী অথবা তার কন্যা সম্পত্তির উত্তরাধিকার হিসাবে গণ্য হবে। কোনো গারো পুরুষের স্ত্রী মারা গেলে তার মৃতা স্ত্রীর মাহারির লোকজনেরা যদি দ্বিতীয় স্ত্রী প্রদানে ব্যর্থ হয়, তবে উক্ত বিপত্মীক পুরুষ নির্দিষ্ট সময় শেষে তার পছন্দমত দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবে এবং সেই স্ত্রী যদি মৃতা স্ত্রীর মাহারির হয়ে থাকে তবে দ্বিতীয় স্ত্রী মৃতা স্ত্রীর সম্পত্তির ভাগীদার হবে। কিন্তু তিনি যদি অন্য মাহারির হয় তা হলে ওই সম্পত্তিতে কোনো ভাগিদার হবে না।

সেক্ষেত্রে বরং স্বামী-স্ত্রী উভয় ওই সংসার পরিত্যাগ করতে বাধ্য হবে। ‘নকনা’নির্বাচিতা কন্যা যদি তার পিতার আপন ভাগ্নেকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে অসম্মতি প্রকাশ করে এবং নিজের পছন্দমত অন্য কাউকে বিয়ে করে– তবে সে নকনার অধিকার হারাবে। অর্থাৎ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠা কন্যাকে নকনা নির্বাচন করা হয়। তবে সর্বকনিষ্ঠা কন্যা যদি কোনো কারণে অযোগ্য বিবেচিত হয় তাহলে পরিবারের অন্য যে কোনো মেয়েকে নকনা নির্বাচন করা যায়। এ ক্ষেত্রে মায়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। তারপরেও চ্রাদের সমর্থন থাকা আবশ্যক। এখানেও নকনা তার পিতার আপন ভাগ্নেকে বিয়ে করতে রাজী থাকতে হবে। পরিবারের নকনা কন্যার সহোদয় ভগ্নীগণ যাদেরকে গারো ভাষায় আগাত্তে বলা হয়, তারা পারিবারিক সম্পত্তির অংশীদার হবে না। নকনা যদি অনুগ্রহ করে কিছু সম্পত্তি দেয়, তাহলেই কেবল সম্পত্তি পাবে। নকনার অকাল মৃত্যু ঘটলে তার বিপত্মীক স্বামীর জন্য যদি অন্য কোনো বোনকে স্ত্রী হিসাবে প্রদান করা হয়, তবে সেই বোন নকনার পূর্ণ মর্যাদা পাবে। অন্য কোনো কারণে নকনা যদি গৃহত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়, সে ক্ষেত্রে নকনার অধিকার হারাবে না। তবে পরবর্তীতে মাহারির চ্রাদের আহ্বানে নকনাকে স্ব-গৃহে ফেরত আসতে হবে। ইহাতে কোনো প্রকার অনিচ্ছা প্রকাশ করতে পারবে না। যদি অনিচ্ছা প্রকাশ করে স্বগৃহে আসতে রাজি না হয় তখন নকনা তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর কন্যাগণ বিপত্মীক পিতাকে লালন পালনে বাধ্য থাকবে। যদি লালনে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে তখন ভরণ-পোষণ বাবদ সম্পত্তির কিছু অংশ দিতে বাধ্য থাকবে। নাবালক অবস্থায় কোনো পিতামাতা উভয়ে মারা গেলে মাতৃগোষ্ঠীর যেকোনো নিকটতম আত্মীয়া কিংবা তাদের অভাবে মাতৃগোষ্ঠীর যে কোনো মহিলা ওইসব অসহায় নাবালকদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং তিনিই অভিভাবক হিসেবে গণ্য হবেন। পরবর্তীতে নাবালিকা কন্যাগণ সাবালিকা হলে তাদের মধ্য হতে নকনা নির্বাচন করা হলে সেই কন্যাই সম্পত্তির মালিক হবেন।

গারোদের সাংসারেক ধর্ম এবং দেবদেবী

গারোদের আদিধর্মের নাম সাংসারেক। ঐতিহাসিকদের মতে, এই সাংসারেক ধর্ম বিশ্বের সংখ্যাগুরু খ্রীষ্টিয়ান এবং ইসলাম ধর্মের চেয়েও প্রাচীন। অনেকের মতে সনাতন বা হিন্দু ধর্মের সমসাময়িক; তাই মেজর এ প্লেফেয়ার তাঁর The Garos গ্রন্থে হিন্দু ধর্মের মত এই সাংসারেক ধর্মকেও অ্যানিমিসম এ বিশ্বাসী বলে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ ব্যাপক অর্থে অ্যানিমিসম শব্দের অর্থ “বহু দেবতা এবং উপদেবতায় বিশ্বাসকে বুঝায়। তবে, অন্যান্য ধর্মের মত এ সাংসারেক ধর্মের কোন প্রমানপত্র বা ধর্মগ্রন্থ নেই। আদিমকাল থেকে এই ধর্ম মুখে মুখে এবং ধর্মাচার পালনের মধ্য দিয়ে আজ পর্যন্ত যৎসামান্য টিকে রয়েছে। গারোদের সৃষ্টিতত্ত্ব প্রায় অন্যান্য প্রধান প্রধান ধর্মবিশ্বাসের অনুরূপ। বিশেষ করে পবিত্র বাইবেলে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে ব্যাপক সাদৃশ্য বিদ্যমান। তাদের বিশ্বাস আদিতে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জলময় ও ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। পরবর্তীকালে প্রধান দেবতা তাতারারাবুগা তার সহচর নস্তু-নপান্তু ও অন্যান্য দেব-দেবীর সহায়তায় পৃথিবী, আকাশমণ্ডল, গ্রহ-নক্ষত্র, সাগররাজি, পর্বতমালা, নানা জীবজন্তু, গাছপালা প্রভৃতি সৃষ্টি করেন। তাতারা-রাবুগা ছাড়াও গারোদের উপাস্য আরো অনেক দেব-দেবী রয়েছে। এসব দেব-দেবীর কারো কারো দায়িত্ব মানুষকে বিষয়সম্পদে সৌভাগ্যশালী করা আবার কারো কারো দয়িত্ব মানুষকে নানাবিধ রোগ-ব্যাধি প্রদানের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা।

শান্তি, নিরাপত্তা, নীরোগ স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের আকাঙ্খায়ই মানুষ দেবতাকে আবিষ্কার করেছে। তাই মানুষ হয়তো জীবনের একেকটা দায়িত্ব একেক দেবতাকে অর্পণ করে নিশ্চিত হতে চেয়েছে। গারো জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। ফলে উল্লেখিত দেবতা ছাড়া জীবনের অন্যান্য বিষয় ও দিকের নিয়ন্তারূপে আরো অসংখ্য দেবদেবীকে শনাক্ত করেছে এবং পূজা করে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে এসব বিশ্বাস প্রায়ই যুক্তিহীন, আবার কোথাও বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিলভ্যও। বহুদেবত্ববাদে বিশ্বাসী গারোদের সংস্কৃতির বিস্তৃত পরিসর জুড়ে আছে উল্লিখিত দেব-দেবীকে নিবেদিত কৃত্য। সব কৃত্যের সমাচারই তাদের জীবন ও সংস্কৃতি। গারোদের আদি ধর্ম বহু-দেবতা ভিত্তিক। এই ধর্মে সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, বজ্র, বৃষ্টি প্রভৃতির পূজার বিধান রয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি গারোরা সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বরাবর বিশ্বাস করে এসেছে। তিনি যে এই পৃথিবীর সবকিছুর স্রষ্টা এ বিশ্বাস গারোদের মধ্যে ছিল। গারোরা একইসঙ্গে মানবদেহে আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী এবং সেই আত্মা যে অবিনশ্বর এটাও তারা বিশ্বাস করে। তারাও হিন্দুদের মতো জন্মান্তর বাদে বিশ্বাসী। গারোদের প্রথাগত বিশ্বাস ও সংস্কারসর্বস্ব একটি অনানুষ্ঠানিক কৃষিভিত্তিক ধর্মোৎসব রয়েছে। জমির ঊর্বরতা বৃদ্ধি, ফসল সংরক্ষণ, রোগশোক, মহামারী, ভূত-প্রেত-রাক্ষস ইত্যাদি অদৃশ্য অপশক্তির অমঙ্গল থেকে বাঁচার জন্য তারা বারো মাসে তেরো কিংবা ততোধিক ব্রত ও পর্ব-পার্বণ পালন করে।

নৃগোষ্ঠীর প্রকৃত পরিচয়টি বিধৃত হয় তার রীতি-নীতির অবয়বে। আদি গারো এবং বর্তমান সাংসারেকদের বিশ্বাস অনুসারে একেক দেবতার মর্জি একেক রূপ। তাদের খুশি করার রীতিও ভিন্ন ভিন্ন। ভিন্ন ভিন্ন তাদের উপাচার, নৈবেদ্য, মন্ত্র এবং পূজার লগ্ন। কৃত্যের বাঁধা ছকে আবদ্ধ জীবন তাই কৃত্যসর্বস্ব। ধরাটি গ্রামের খামাল দীনেশ নকরেক, চুনিয়া গ্রামের খামাল জনিক নকরেক, সাইনামারী গ্রামের খামাল নরেশ মৃ প্রমুখের সাথে সাক্ষাৎকারের সময় জানিয়েছেন সাংসারেক ধর্মে প্রায় ৭ হাজার দেবতা, ৭০০ উপদেবতাদের উপাসনা, মন্ত্রতন্ত্র, জাদু-টোনা ইত্যাদি নিয়েই সাংসারেক ধর্ম। এরা সর্বপ্রাণবাদী ও বস্তুর দ্বৈতসত্তায় বিশ্বাসী এবং প্রকৃতি ও জড়বস্তুতে প্রাণ আরোপ করে। এরা সাপ ও বাঘকে মনে করে প্রেতাত্মার দেহীরূপ। কোনো মানুষ দিনে মানুষ থাকে এবং রাতে বাঘ হয়ে যায়। গারো ভাষায় এটাকে বলে মাৎসাদু মাৎসাদে। কোনো কোনো গাছ, পাথর, টিলা ভূতপ্রেতের আবাস, এ বিশ্বাসে তারা এগুলোকে এড়িয়ে চলে। গারোদের অনুষ্ঠানাদি উদযাপন, মহামারীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ব্রত পালন, তাবিজ এবং ভেষজ দিয়ে রোগ-বালাইয়ের নিরাময় ইত্যাদি যারা করেন, তারা সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি। এই ব্যক্তিবর্গ খামাল নামে পরিচিত। আর এই খামাল বা কবিরাজদেরকে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি মনে করা হয়।


গারোরা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড় ও বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, শেরপুর ও নেত্রকোণা অঞ্চলের গারো পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চল, মধুপুর ও সিলেটে বসবাসকারী আদিবাসী। এরা মোঙ্গলীয় জাতিসত্তার তিব্বতী-বর্মণ জাতিগোষ্ঠীর বোড়ো শাখাভুক্ত। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর মত গারোদের সামাজিক বিবাহের রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রথা। তবে ভারতের গারো এবং বাংলাদেশের গারোদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিতে বেশ পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশের গারোদের বেশিরভাগই খ্রিষ্টান। তবে বেশিরভাগ গারোর মধ্যে এখনো রয়েছে তাদের প্রাচীন গোষ্ঠীপ্রথায় প্রচলিত বেশ কয়েকটি বিবাহরীতি। টু-নাপা হলো বাসর বিয়ে। এই রীতিটি আদি গারো সম্প্রদায় এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী গারোদের মধ্যে এখনো প্রচলিত রয়েছে। বিয়ে উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী তাদের নিজ ইচ্ছায় একই বিছানায় শয়ন করে। সাধারণত অভিভাবকদের অনুমতিতেই তা হয়ে থাকে, কিন্তু কখনো কখনো অভিভাবকদের অজান্তে প্রেমের সম্পর্ক হলে পাত্র-পাত্রী এই রীতিতে নিজেরা বিয়ে করে এবং অবশ্যই উভয়ের মধ্যে যৌন সংসর্গ হয়ে থাকে। যৌন সংসর্গ না হলে প্রণয় নিবেদন অগ্রাহ্য বলে বিবেচিত হয়। শেক্কা বিয়ে বলতে বোঝায় নারী-পুরুষ স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একে অপরকে নিজ ইচ্ছায় গ্রহণ করে বসবাসের জন্য অন্য কোথাও চলে যাওয়া। যদি অবিবাহিতদের মধ্যে শেক্কা বিয়ে ঘটে তবে আ’খিম বা মিমাংসার বাধ্যবাধ্যকতা থাকে না। তখন সাধারণত কোনো জরিমানা করা হয় না এবং তাদেরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বাস করতে দেয়া হয়। কিন্তু কখনো কখনো নারী-পুরুষ উভয়কে জোরপূর্বক পৃথক করা হয় এবং তাদেরকে প্রহার করা হয়। যদি একপক্ষ বিবাহিত ও অন্যপক্ষ অবিবাহিত হয়, বিবাহিত পক্ষের আত্মীয়বর্গ অবিবাহিত পক্ষের আত্মীয়বর্গের কাছ থেকে জরিমানা আদায় ও ভোগ করে। যদি উভয় পক্ষ বিবাহিত হয়, তবে উভয় পক্ষেরই আত্মীয়বর্গ জরিমানা দিতে বাধ্য।


জাতিগত ভাবে বা এলাকাভিত্তিক যেমন খাবার দাবার, খাদ্যাভ্যাস, রান্নার ভিন্নতা হয় তেমনি ধর্মীয়ভাবেই কিছু কিছু খাবারের বিধি-নিষেধ আছে যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। গারোদের কিছু প্রিয় খাবার তুলে ধরছি। গারো আদিবাসীরা বিভিন্ন ধরনের লতা-পাতাও খায় যা শরীরের জন্য উপকারি। চু, স্থানীয়ভাবে বানানো ভাত দিয়ে বানানো চু, যা ছাড়া গারোদের অতিথি আপ্যায়ণ বা কনো অনুষ্ঠান চিন্তাই করা যায়না। এছাড়াও, গারো আদিবাসীরা কুচিয়া মাছ, কাকড়া, কচ্ছপ, শামুক বা বাঁশ কুড়ল, বিভিন্ন গাছের লতা পাতাসহ বিভিন্ন খাবার খেয়ে থাকেন।

কৃষি কাজ গারোদের প্রধান পেশা। যারা গভীর পার্বত্য এলাকায় বসবাস করে তাদের প্রধান পেশা জুম চাষ, কিন্তু যারা সমভূমিতে বসবাস করে তারা সমভূমির অন্যান্য অধিবাসীদের মতোই হালচাষ করে জীবিকা-নির্বাহ করে। জুম চাষ গারোদের প্রাচীন চাষ পদ্ধতি। এটা শুধু গারোদেরই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন আদিবাসী এবং পার্বত্য জনগোষ্ঠীর প্রাচীন চাষ পদ্ধতি। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, নব্য প্রস্তর যুগের শুরুতে আদিম মানবসমাজে জুম চাষের প্রচলন শুরু হয় এবং ওই সময়ই তা মোটামুটিভাবে বর্তমানের রূপ লাভ করে। ল্যাটিন আমেরিকা এবং আফ্রিকায় ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও জুম চাষের ব্যাপক প্রচলন ছিল। সুইডেনের মতো উন্নত দেশেও কোনো কোনো এলাকায় ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্তও জুম চাষের প্রচলন ছিল। গারো পাহাড়ের পার্বত্য এলাকায় জুম চাষ এক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। গভীর বন কেটে বড় বড় গাছপালা পুড়িয়ে চাষোপযোগী করে তোলা হয়। প্রতি দু’বছর অন্তর নতুন নতুন জায়গা এমনি করে জুম চাষের জন্য নির্বাচন করা হয়। কারণ এসব পার্বত্য অনুর্বর জমিতে একাধারে দু’বছরের বেশি ফসল ফলানো যায় না। গারো পাহাড়ে এ রকম জুম চাষোপযোগী পার্বত্য এলাকাকে আখিং বলা হয় এবং এ রকম আখিং গারো পাহাড়ে সংখ্যায় কয়েকশর মতো হবে। একেকটা আখিং একেক জন আখিং নক্সার অধীনে থাকে। এই নক্মা সব দিক দিয়ে বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তি। বাংলা ভাষায় নক্মা শব্দের আক্ষরিক অর্থ ধনী। তার গ্রামের অধিবাসীদের পরিবার পিছু সমভাবে জুম চাষের জমি ভাগ করে দেয়া আখিং নক্মার দায়িত্ব। জুম চাষের জমি ভাগ করার সময় তার নিজের জন্য এবং তার পরিবারের অন্যদের জন্যও তিনি কিছু অংশ রেখে দেন। জমি ভালো হয়ে গেলে তার প্রত্যেক পরিবার নিজ নিজ ভাগের জমি পরিষ্কার করা আরম্ভ করে দেয়।

জংলি বাঁশ এবং বড় বড় গাছপালায় আবৃত এসব জমি পরিষ্কার করা এক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ডিসেম্বর মাস হতে কাজ শুরু করে মার্চ মাস নাগাদ সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে ফেলা হয়। এ সময় গাছের ডালপালা পুড়িয়ে একদিকে যেমন তাড়াতাড়ি পরিষ্কার করা সম্ভব হয় তেমনি পোড়া ছাঁই এবং আবর্জনাদি দ্বারা জমিতে উত্তম সার দেয়া হয়ে যায়। এসব জুম ক্ষেতে দু’বছরের বেশি ফসল ফলানো যায় না। দু’বছর আবাদের পরই অন্যত্র নতুন জায়গা নির্বাচন করতে হয় এবং পুরনো জুম ক্ষেতটি অনেক বছরের জন্য অনাবাদী ফেলে রাখা হয়। অনেক বছর পর সেখানে নানাবিধ লতাগুল্ম এবং গাছপালা জন্মে জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পেলে পরে সেখানে পুনরায় জুমচাষ করা হয়।পরিবারের প্রতিটি কর্মক্ষম ব্যক্তিই জুম ক্ষেতে কাজ করে থাকে এবং তুলনামূলকভাবে পুরুষের চেয়ে মেয়েরাই বেশি কাজ করে থাকে। তবে গাছপালা কেটে জঙ্গল পরিষ্কার করার কাজসহ দৈহিক পরিশ্রমের কাজ পুরুষরাই সম্পন্ন করে থাকেন। পাহাড়ে অসংখ্য গর্ত করা এবং সেখানে পরিমাণমত বীজ ফেলে মাটিচাপা দেওয়ার কাজ গারোরা নিখুঁতভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই করতে পারে।

ধান এবং তুলা ছাড়াও আলু, মরিচ, আদা, ফুটি, তরমুজ, বেগুন, বিভিন্ন ধরনের কলাই (বিলি্লক, খারেক) প্রভৃতি ফসল একই জমিতে আবাদ করা হয়। বিভিন্ন ফসল এবং তরিতরকারি বিভিন্ন সময়ে পাকতে আরম্ভ করে। ভুট্টা, ফুটি প্রভৃতি প্রথমে পাকে। আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসে ধান কাটা শুরু হয় এবং সব শেষে নভেম্বর ডিসেম্বর মাসে তুলা সংগ্রহ করা হয়। ফসল বোনা হতে আরম্ভ করে ঘরে ফসল তোলা পর্যন্ত কমপক্ষে তিনবারের মতো আগাছা নিড়িয়ে ক্ষেত পরিষ্কার রাখতে হয় এবং এই নিড়ানির কাজ প্রধানত গারো মহিলারাই নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে থাকে। গারোদের ধান কাটার পদ্ধতিও বেশ অভিনব। ধান ভালোভাবে পাকলে মেয়ে-পুরুষ সবাই একত্রে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কাস্তের সাহায্যে শুধু পাকা শীষ ক্ষিপ্রহস্তে কাটতে থাকে এবং পিঠে রক্ষিত বড় ঝুড়িতে (খক্) ভর্তি করে। একেকটা ঝুড়ি ভর্তি হয়ে গেলে সেই শস্য শুষ্কাবস্থায় গোলাঘরে (ঝামনক্) সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখে। সেই শস্য সারা বছর শুকনা এবং পরিষ্কার থাকে। পরে প্রয়োজন মতো গোলাঘর থেকে কিছু কিছু নামিয়ে মেয়েরা পায়ের সাহায্যে এগুলো মাড়িয়ে ধান বের করে নেয়। গারো ভাষায় একে ‘মি নাক্কা’ বলা হয়। গারোরা সাধারণত আতপ চাল ব্যবহার করে থাকে এবং তারা ঝুম ক্ষেতে যেসব ধান আবাদ করে সেগুলোরও আলাদা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আতপ এবং নতুনাবস্থায় চাল সামান্য সুগন্ধিযুক্ত থাকে।

তবে এ ধানে ফড়িং এবং পোকার আক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে এবং পোকা আক্রমণযুক্ত ধানের চাল অপুষ্ট, মাঝে মাঝে কালো রঙয়ের হয়ে যায় ও খেতে বিস্বাদ লাগে। শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে এই ধান পাকতে আরম্ভ করে এবং এর ফলন বেশ ভাল হয়। মিমিত্তিম্ (চর্বিযুক্ত ধান) আকারে মোটা চ্যাপ্টাকৃতির এবং সাদা-কালো ডোরাকাটা রঙয়ের হয়ে থাকে। এর চাল বেশ সুগন্ধিযুদ্ধ এবং রান্না করলে ভাত নরম আঁঠালো হয়ে থাকে। গারোরা প্রধানত মদ তৈরির কাজে এই চাল ব্যবহার করে। ভাঁপে সিদ্ধ করলে এ চালের ভাত অতি উপাদেয় খাদ্যে পরিণত হয়। গারো ভাষায় এ রকম রান্নাকে ‘মিমিল্ রিদ্ধা’ বলা হয়। এ ধানের ফলনশক্তি কম এবং শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি এই ধান পাকতে শুরু করে। বাংলাদেশি গারোদের কৃষি পদ্ধতি সমভূমির অন্যান্য সমাজের লোকদের মতোই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কাদা মাটির রোপা ধানের চাষ করে এবং চাষকর্মে গরু-মহিষের সাহায্য নিয়ে থাকে। ধান চাষের পাশাপাশি তারা পাট চাষও করে এবং নানা ধরনের শাক-সবজি, রবিশস্য উৎপন্ন করে। আধুনিক কৃষি পদ্ধতিও অনেকেই ইতোমধ্যে রপ্ত করে নিয়েছে।
এই নিউজ মোট   7764    বার পড়া হয়েছে


ইতিহাস-ঐতিহ্য



বিজ্ঞাপন
ওকে নিউজ পরিবার
Shekh MD. Obydul Kabir
Editor
See More » 

প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ মো: ওবাইদুল কবির
ঠিকানা : ১২৪/৭, নিউ কাকরাইল রোড, শান্তিনগর প্লাজা (২য় তলা), শান্তিনগর, ঢাকা-১২১৭।, ফোন : ০১৬১৮১৮৩৬৭৭, ই-মেইল-oknews24bd@gmail.com
Powered by : OK NEWS (PVT) LTD.