12:00am  Wednesday, 29 Jan 2020 || 
   
শিরোনাম
 »  ঝালকাঠিতে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন     »  ভবনের আগুনে পুড়ে মৌলভীবাজারে একই পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত     »  আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আওয়ামী লীগকে জেতাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে     »  ফজলে নূর তাপস-সাঈদ খোকন; আমরা দুই ভাই      »  আজীবনের জন্য বহিষ্কার হলো ঢাবির ৬৭ শিক্ষার্থী      »  কমলা বিক্রেতা হাজাব্বারকে একটি অনুভূতি এনে দিল পদ্মশ্রী পুরস্কার     »  করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে দুই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে     »  ঢাকা সিটি নির্বাচনের জন্য বিএনপি অস্ত্রধারী গুন্ডাদের ঢাকায় এনে জড়ো করছে     »  ৪৩২৪ কোটি ব্যয়ে ৯ প্রকল্প অনুমোদন দিল একনেক      »  সোলাইমানির হত্যাকারী মাইকেল ডি. অ্যান্ড্রু তালেবানের হামলায় নিহত   



দেশ স্বাধীন না হলে আমরা কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতাম না
৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫ পৌষ ১৪২৬, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১



যুদ্ধদিনের অম্লান স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নবী হোসেন। ফুলপুর উপজেলার সিংহেশ্বর ইউনিয়নের সঞ্চুর গ্রামের মৃত উমর আলী শেখের ছেলে মোহাম্মদ নবী হোসেন তখন ১৯ বছরের যুবক। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ময়মনসিংহ শম্ভুগঞ্জ মোজাহারদী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র।

সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট কড়ইতলা ছিল পাকবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি। সেদিন ছিল ২ নভেম্বর রাত ৩টায় ভারতের ফুলছড়ি থেকে এ ঘাঁটিতে পাকবাহিনীর সাথে গুলিবিনিময় হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেলীখালী নামক এ ভযাবহ যুদ্ধে ৮০ জন হানাদার নিহত হয়। আমাদের ৮ জন মুক্তিযুদ্ধা শাহাদাৎ বরণ করেন। এ যুদ্ধের ইতিহাস মনে হলে আজও গাঁ শিউরে উঠে। সারা রাত এক সাথে যুদ্ধ করলাম হযরতকে নিয়ে। সকালে দেখলাম হযরতের রক্তাক্ত দেহ মাটিতে পড়ে থাকতে। ভয়াবহ এ যুদ্ধে ভোরের সূর্য ওঠার আগেই তেলীখালী হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে ঢুকে পড়ি। আমাদের চারদিকের আক্রমণ তুমুল এ যুদ্ধে সফলতা আসে। এ ঘাঁটি দখল হলে ভেতরে গিয়ে দেখলাম পাক-বাহিনীর গোলাবারদ, অস্ত্র, তাদের সারি সারি ক্ষত-বিক্ষত দেহ পড়ে আছে। যুদ্ধের ভয়বহু পরাজয় নিশ্চিত হওয়ায় বাকীরা পালিয়ে গেছে। ভেতরে ধর্ষীতা নারীর আর্তনাদ। অন্যদিকে সহযোদ্ধাদের লাশ। ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দেহগুলো সকালে  বাংলাদেশের সীমান্তে সমাধি করি। ফুলপুর উপজেলার ভাইটকান্দি এলাকার দুর্দান্ত সাহসী হযরত হঠাৎ একটি শেলিংয়ের স্পিন্টারের আঘাতে মারা যায়।


তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে পাকিস্তানিদের রোষাণলে পড়েন এবং   শাসক গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। উদ্দেশ্য ছিল দেশের আন্দোলনকে স্তব্ধ করে রাখা। এ দেশ থেকে পাক-হানাদার বাহিনীমুক্ত করতে বঙ্গবন্ধুর ডাকে আন্দোলনে যোগ দেন মুক্তিযোদ্ধা নবী হোসেন।

যুদ্ধদিনের অম্লান স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কালের কণ্ঠকে জানান, সে সময় বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন দেশের মানুষের জন্য মুক্তি ও পাকিস্তানিদের অত্যাচার নির্যাতন বন্ধ করা ছিল উদ্দেশ্য। এ ছাড়া আর আমাদের কোনো উপায় ছিল না।

মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নবী হোসেন ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম মৃত উমর আলী শেখ, মায়ের নাম মৃত কুলজান বেগম। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নবম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা উক্তীর্ণ হয়ে দশম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। ঐ সময় ডানপিটে টগবগে যুবক তিনি। যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণার বিষয় নিয়ে সিংহেশ্বর ইউনিয়নের সঞ্চুর গ্রামের নিজ বাড়িতে কথা হয় তাঁর সাথে।

তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে উত্তাল মুখর হয় রাজপথ। যে যার অবস্থান থেকে পাক-বাহিনী হটাও আন্দোলনে নেমে পড়ি। আন্দোলনের শুরুতেই তারাকান্দার শ্যামগঞ্জ বাজারে ভূমি অফিস ধ্বংস করি এবং রেললাইন গুঁড়িয়ে দেই। হঠাৎ খবর আসে পাকসেনা ও পুলিশের গুলিতে গৌরিপুর সরকারি কলেজের ১ম বর্ষের হারুণ নামের এক ছাত্র নিহত হন। একই দিনে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে মিটিং ঘোষণা করে মার্শাল জারি করে পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী। সেখান থেকে কোনোমতে পালিয়ে ময়মনসিংহ শহরে চলে আসি। শহরে তখন রাস্তায়-রাস্তায়, পাক-সেনাদের মহড়া। রাস্তা-ঘাট যানবাহন ও মানুষ শূন্য হয়ে পড়ে। ক্ষুদার্থ অবস্থায় হাহাকার হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে চলে আসি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের গঙ্গা স্নান উপলক্ষে ব্রহ্মপুত্র নদে কলা ভাসিয়ে দিলে সাঁতার কেটে তুলে তুলে ক্ষুদার জ্বালা মেটাই। সূর্য ডোবার আগেই পায়ে পথ হেঁটে হেঁটে ঐদিনই নিজ বাড়ি সঞ্চুর গ্রামে ফিরে আসি।

মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নবী হোসেন জানান, নিজ বাড়িতে ২ সপ্তাহ থাকার পর ফুলপুর থানার দুজন দারোগার সাথে সুসম্পর্ক হয়। একজন এসআই আলী-আকবর ও এসআই মজিত। তার মধ্যে আলী আকবর ছিলেন দুঃসাহসিক পুলিশ অফিসার। তিনি ফুলপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল রতনের বাবা। প্রাথমিকভাবে ফুলপুর খেলার মাঠে পুলিশ অফিসার আকবর ট্রেনিং ও আচমকা হামলা মোকাবেলা করার প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন।

বীর এ মুক্তিযুদ্ধা বলেন, সে সময়ের উত্তাল দিনের ঘটনা ফুলপুর খেলার মাঠে ট্রেনিং করানো অবস্থায় পাক-বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার হালুয়াঘাট যাচ্ছিল। তিনি (আলী আকবর ভাই) সরাসরি পাক-বাহিনীর কপটারটিকে গুলি করতে থাকেন। অল্পের জন্য হেলিকপ্টারটি চলে যায়। সেদিন তাঁর দুঃসাহসীকতায়   মুক্তিযুদ্ধে আরো বেশী সক্রিয় হতে আমাকে উৎসাহিত করে।

বীর এ মুক্তিযোদ্ধা ১১নং সেক্টরের অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন উইং কমান্ডার  হামিদুল্লাহ খান। সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশে বেশ কয়েকজন মিলে গোয়াতলা হয়ে নেওলা খুরী সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকে পড়েন। সরাসরি ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্টে চলে যায়।

তিনি জানান, পায়ে হেঁটে যেতে যেতে ক্ষুধার্ত অবস্থায় শরীর দুর্বল হয়ে যায়। সেখানে ডাল পুরি ও চা খাই। এ রেজিমেন্টে সন্ধ্যা হয়। পরদিন পাঠানো হলো আমাদের বাঘমারা ইউথ ক্যাম্পে। এ ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন এনায়েত রহমান। সেখানে সারা রাত কাটানোর পর পাঠানো হলো শিববাড়ী। একদিন পর পাঠানো হলো নালিতাবাড়ির উত্তরে ডালু ক্যাম্পে। এ ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন অধ্যক্ষ মতিউর রহমান স্যার।  মুক্তিযুদ্ধা মেজবাহ, মমতাজ, হযরতসহ ৬০ জন সঙ্গী না খেয়ে সকলেই খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। রাত তখন ১২টা। অধ্যক্ষ মতিউর রহমান স্যার আমাদেরকে পেয়ে দারুণ খুশী। তিনি অল্প চাল, মরিচ, লবণ, মাশের পালটা ডাল দিলেন। চালের দুর্গন্ধে শুধু একবার মুখে দিয়ে পানি পান করে জীবন বাঁচাই। এবার রাতে ঘুমানোর জন্য তিনি একটি কম্বল ও একটি বস্তা দিলেন। তখন পাহাড়ের জঙ্গল কেঁটে পরিস্কার করি ঘুমানোর জন্য। জঙ্গলের ভেতরে চিনা-জোঁক ছিল। সারা রাত আর ঘুম নেই দুচোখে। এভাবে ডালু ইউথ ক্যাম্পে থাকার পর তুরা ট্রেনিং সেন্টারে ডাক পড়ে। ট্রেনিং সেন্টারে ২ দিন শপথ, ৩ দিন জঙ্গল ট্রেনিং বাকী ২৬ দিন যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য ট্রেনিং করানো হয়। ট্রেনিং করার পর আমাকে পাঠানো হয় ডালু (এফএফ) ক্যাম্পে। ঐ ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন আব্দুল গণি ভাই। আব্দুর রব ভাই ছিলেন এ ক্যাম্পেই। রব ভাইয়ের  নির্দেশে এক সপ্তাহ থাকার পর আবুল হাশেমকে নিয়ে একটি কম্পানি গঠন করি। হাশেম ভাই ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি। আমাদের এখানে ট্রেনিং করান এমএসসি মোসলেম উদ্দিন। এক সময় আবুল হাশেম ভাইয়ের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের এ দলটি বাংলাদেশের মধ্যে ঢুকে পড়ি। প্রথমে গোয়াতলা হয়ে কাশিমালা বাজারে অবস্থান নেই। সেখান থেকে নেওলা খুড়ি  হয়ে জিওক্ক্যা বাজারে চলে যায়। আশপাশের পুকুর পার, ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকি। কিভাবে পাক-বাহিনীকে খতম করা যায় মাথায় সবসময় চিন্তা ছিল। আলবদর, রাজাকার, পাকবাহিনীকে মোকাবেলা করতে ভারতের পথ পারি দিতে থাকি। নিজ এলাকায় বালিয়া বাজারে পাকহানাদার মুক্ত করতে রওনা হয়। পথের মধ্যে হঠাৎ আমাদের ওপর আক্রমণ হয়। এলাকাটি ছিল রাজাকার-আলবদরের ঘাঁটি। এখানে সম্মুখযুদ্ধে প্রচণ্ড বাঁধার সম্মুখীন হই। এ যুদ্ধে ১ জন রাজাকার মারা যায় ও একজন গুলি খেয়ে পালিয়ে যায়। মূহুর্তের মধ্যে আলবদর-রাজাকাররা এলাকা ত্যাগ করতে থাকে। এরপর আমরা খাশিগঞ্জ এলাকায় আক্রমণ করি। ঐখানে পাক-বাহিনীর ক্যাম্প থাকায় লড়াইটা ছিল দুর্দান্ত। এক সময় জঙ্গলে পড়ে যাই। সারা শরীরে গুল্ম জাতীয় গাছের (চুতরা পাতা) লেগে যায়। সহ্য না করতে পারায় পানিতে নেমে যাই। কয়েকজন ধরে আমাকে মালিশ করলে আরাম পাই। এরপর ভারতে দিকে আবারও যাত্রা শুরু। যাত্রা পথে বওলা পিন্সিপাল আব্দুস সাত্তার স্যারের সাথে সাক্ষাৎ করি। পরিবারের খবর জানাতে বাড়িতে চিঠি পাঠাই। ভারতে যাত্রাপথে হালুয়াঘাট কড়ইতলা গুলিবিনিময় হয় পাকবাহিনীর সাথে। কড়ইতলা ছিল পাকহানাদার বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি। আমরা ফুলছুরি থেকে পাল্টা আক্রমণ করি। সেখানে এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেদিন ছিল ২ নভেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেলী-খালী নামক এ যুদ্ধে আমাদের ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ বরণ করলেও পাকবাহিনীর প্রায় ৮০ জন মারা যায়। ঐ সময়ে আমাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে এ ঘাঁটি পাকসেনাদের দুর্গ ভেঙে যায়। রাজাকার-আলবদরসহ পাকবাহিনীরা পালিয়ে যায়। শত্রুমুক্ত হয় তেলিখালি-কড়ুইতলা এলাকা। এক সময় পাক-হানাদার বাহিনীকে দেশ থেকে মুক্তি করলাম। দেশ স্বাধীন হলে ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর আহ্বানে ময়মনসিংহ টিটিসি হলে হাজির হলাম। তাঁর স্বাক্ষরিত মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট ও ৫০ টাকার একটি নোট পেলাম। এটাই ছিল আমার ৯ মাসের সাহসিকতার পরিচয়ের বড় অর্জন।

মুক্তিযুদ্ধা মোহাম্মদ নবী হোসেন ফুলপুর উপজেলা সাবেক কমান্ডারের দায়িত্বপালন করেছেন। একজন সাদা মনের মানুষ হিসেবে তিনি সকলের কাছে পরিচিতি। সংসার জীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জনক। ছেলে মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন মেহেরপুর জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক। বর্তমানে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। মেয়ে নুরজাহান বেগম ময়মনসিংহ মুমিন্নেসা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপিক। স্ত্রী আমিনা খাতুন গৃহিনী। তিনি জানান, দেশ স্বাধীন না হলে আমাদের সন্তানেরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকতে পারতো না।


এই নিউজ মোট   1422    বার পড়া হয়েছে


মুক্তিযুদ্ধ



বিজ্ঞাপন
ওকে নিউজ পরিবার
Shekh MD. Obydul Kabir
Editor
See More » 

প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ মো: ওবাইদুল কবির
ঠিকানা : ১২৪/৭, নিউ কাকরাইল রোড, শান্তিনগর প্লাজা (২য় তলা), শান্তিনগর, ঢাকা-১২১৭।, ফোন : ০১৬১৮১৮৩৬৭৭, ই-মেইল-oknews24bd@gmail.com
Powered by : OK NEWS (PVT) LTD.