আওয়ামী লীগ চাচ্ছে পুরনো ধারার রাজনীতিতে ফিরতে

অনুসন্ধানী জাতীয় তথ্য-প্রযুক্তি প্রচ্ছদ মুক্তমত রাজনীতি হ্যালোআড্ডা

চরম জনরোষে হারিয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন অনেকেই, কেউ কেউ হয়েছেন কারাবন্দি, অসংখ্য মামলার আসামি হয়ে প্রায় সকল স্তরের নেতাকর্মীরা আছেন আত্মগোপনে। তবু চিন্তা-চেতনায় রয়ে গেছে সেই পুরনো ধারা। আর সেই ংধারায় রাজনীতিতে ফিরতে চান লাগাতার প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। সম্প্রতি গোপালগঞ্জ, রাজধানীর সচিবালয়সহ বিভিন্নস্থানে সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক তৎপরতায় তারা এমন বার্তাই দিচ্ছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের রাজনীতিটাই সংঘাতময়। তবে তাদের ফেরাটা নির্ভর করে জনসমর্থনের ওপর। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। কারা কীভাবে রাজনীতি করবে সেটা তাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। এ ব্যাপারে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফ ও বাহাউদ্দিন নাসিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, সময় আসেনি কথা বলার। সময় আসলে কথা বলবো। বিগত দিনের কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের আত্মোপলব্ধি কী, রাজনীতিতে কীভাবে ফিরতে চান-এমন প্রশ্নে ক্ষুব্ধ হন দুজনই। বলেন, সময় হলে এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া হবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতারা ধীরে ধীরে সংহত হয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ করে ভারতের দিল্লি এবং কলকাতায় বিভিন্ন সময় বৈঠক করতে সমর্থ হচ্ছেন। একইভাবে দেশের ভেতর যারা আত্মগোপনে আছেন তারাও নানাভাবে সক্রিয় হচ্ছেন। এ তথ্যের সত্যতা মিলে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা মির্জা আবদুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীর কথায়। ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই মির্জা আবদুল কাদের ৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সপরিবারে আত্মগোপনে যান। তার ওই ঘনিষ্ঠ সহযোগীর তথ্য মতে, তিনি এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। তাদের ধারণা যেকোনো সময় দেশে প্রতিবিপ্লব হবে এবং সেটা ৫ই আগস্টের রূপ ধারণ করবে। সেই স্বপ্নে বিভোর মির্জা কাদেরের মতো নেতারা। ইতিমধ্যে এর কিছু অনুশীলনও তারা করেছেন।

অপরদিকে একই পন্থায় একের পর এক উস্কানি এবং বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। পিছিয়ে নেই তার দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সমপ্রতি এক সাক্ষাৎকারে ওবায়দুল কাদের অকপটে বলেছেন, তিনি বাংলাদেশে থেকেই তিন মাসের মধ্যে ব্যাপক অস্থিরতা, বিক্ষোভ কর্মসূচির বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। তবে নেত্রী তাকে আন্দোলনের সবুজ সংকেত না দেয়ায় তিনি ভারত চলে যান। তবে গত সপ্তাহে প্রবাসী সাংবাদিক সুলতানা রহমানকে দেয়া আরেক সাক্ষাৎকারে ওবায়দুল কাদের বাংলাদেশের সেনাপ্রধান সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে জঙ্গি হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করে ওই দিনের ভূমিকার জন্য সেনাবাহিনীর সমালোচনা করেন। ভারতের আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কথা স্বীকার করে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি এখন শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে জঙ্গিবাদী সরকারের অবসানে আমার যা দায়িত্ব তা পালন করছি। আওয়ামী লীগ এদেশের বেশির ভাগ লোকের প্রতিনিধিত্ব করে দাবি করে কাদের বলেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে দেশে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না।

ওবায়দুল কাদেরের মতো সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ভারতীয় মিডিয়া দ্য ওয়ালকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের মতো নতুন করে দেশ স্বাধীনের কথা বলেছেন। এর আগে সাবেক তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত দ্য প্রিন্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কর্মসূচির আভাস দেন। তাছাড়া বিভিন্ন ভারতীয় মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা। ডয়েচে ভ্যালে, দি প্রিন্টসহ বিভিন্ন মিডিয়া বেশ গুরুত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য প্রকাশ করছে। এসব বক্তব্যের অংশবিশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইউটিউবে এসব বক্তব্য নিয়ে কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে থাকা কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য গত ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে নানা কর্মসূচির ঘোষণা দেয় আওয়ামী শীর্ষ নেতৃত্ব। যদিও সেই ঘোষণায় কোনো সাড়া মেলেনি। তেমন সাড়া দিচ্ছেন না মাঠপর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও। তারপরও ভারতে বসেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন আওয়ামী লীগের প্রথম সারির বেশ কিছু নেতা। এসব নেতাদের একটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া কিছু নেতা উত্তরবঙ্গ, দিল্লি, ত্রিপুরায়ও আছেন।

দলটির বিভিন্ন সূত্র মতে, প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে অন্তত ২০০ জন পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে সাবেক সরকারের শীর্ষ পদাধিকারী, মন্ত্রী এবং অন্তত ৭০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন, যাদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। তবে ইউরোপসহ আরও কয়েকটি দেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ভারতে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠক হচ্ছে অ্যাপে। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে শেখ হাসিনার নিয়মিত যোগাযোগ হয় অ্যাপের মাধ্যমে। তবে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার সঙ্গে কেউ দেখা করতে পেরেছেন কিনা তা জানা যায়নি। অ্যাপসের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে মেসেজ দিয়ে রাখলে তিনি সুবিধামতো সময়ে উত্তর দেন। আবার বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন বলে জানা যায়। তবে কোনো নির্দেশনাতেই শান্তির বার্তা বহন করে না বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের পতনের বছর পূর্ণ হচ্ছে। দলের প্রধান থেকে শুরু করে অনেক নেতাকর্মীর নামে গুরুতর অপরাধের ধারাবাহিক তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু তাদের কোনো একজন নেতাকর্মীর কথা এবং কাজে আত্মোপলব্ধি কিংবা অনুতাপ অনুশোচনার লেশমাত্র দেখা মিলছে না। বরঞ্চ দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা দৌর্দণ্ড প্রতাপের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।

আরো পড়ুন : কালীগঞ্জে বসত ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা

Share The News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *