জীবন ও মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে বাংলাদেশ নামের এই মাতৃভূমিকে যারা স্বাধীন করেছিলেন, তাদেরই তো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম। শুধু এই কাজটি করেও যদি তিনি থেমে যেতেন তাহলেও তার নামটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে চিরকাল নক্ষত্রের বিভূতি নিয়ে জ্বলজ্বল করত। কিন্তু তিনি তা করেননি, তিনি ইস্পাতদৃঢ় শপথ নিয়ে নেমে পড়লেন রাষ্ট্র বিনির্মাণের আরও কষ্টসাধ্য যুদ্ধে। দারিদ্র্য, বেকার সমস্যা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। এই প্রাণচঞ্চল কর্মবীর মানুষটি খুবই দ্রুততার সঙ্গে উপলব্ধি করলেন, দেশকে জাগাতে, অর্থনৈতিক সংকট মোচন করতে চাইলে, আধুনিক ও উন্নত বিশ্বের সঙ্গে হাতে হাত রেখে এগিয়ে যেতে চাইলে, দরকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন, দরকার ব্যাপক, বিশাল শিল্পায়ন।
৭৪ বছরের যে জীবন তিনি পেয়েছিলেন তার প্রতিদিন প্রতিটি ক্ষণকে তিনি উৎসর্গ করে গেছেন দেশ ও জাতির কল্যাণে। অসামান্য মেধাবী, অসম সাহসী, দুর্দান্ত স্বপ্নবান, সৃষ্টি চঞ্চল প্রাণবান, প্রচণ্ড পরিশ্রমী, অনন্য সাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন এই মানুষটি পা বাড়ালেন শিল্পায়নের পথে। তার দরদি হাতের সোনার ছোঁয়ায় একে একে গড়ে উঠল বস্ত্র, ইলেকট্রিক, পোশাকশিল্প, রাসায়নিক, চামড়া, পানীয়, টয়লেট্রিজ, মোটরসাইকেল, আবাসন খাতসহ অর্ধশতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ধীরে ধীরে পত্রপুষ্পে পলবিত হয়ে উঠল যমুনা গ্রুপের মতো বিশাল শিল্পসাম্রাজ্য। গড়ে উঠল যমুনা টেলিভিশনের মতো দেশসেরা টিভি চ্যানেল, পাখা মেলল দৈনিক যুগান্তরের মতো পাঠকনন্দিত জনপ্রিয় সংবাদপত্র। শিরে ধারণ করল তার অবিনাশী উচ্চারণ ‘আমরা সত্যের সন্ধানে নির্ভীক’।
দেশ মুক্তির যুদ্ধে তিনি যেমন পালন করেছেন অগ্রণী ভূমিকা, তেমনই শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও তিনি অন্যতম অগ্রনায়ক। দেশকে তিনি যেমন এনে দিয়েছেন অহংকার, অভূতপূর্ব শিল্প সুষমা, তেমনই লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান দিয়ে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য দূরীকরণেও রেখেছেন অসামান্য ভূমিকা। তার মৃত্যু তাই সাধারণ কোনো মৃত্যু নয়। নিজেকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। তাই তো তার শেষযাত্রার পথের ধূলি ভিজে গেছে মানুষের চোখের পানিতে। হৃদয়োৎসারিত ভালোবাসার পুষ্পবৃষ্টিতে গেছে ভরে। তার মতো স্বপ্নসারথি মানুষের জন্যই বোধকরি আধুনিক চীনের নির্মাতা চেয়ারম্যান মাও সে তং বলে গেছেন, বেশির ভাগ মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা, আর কোনো কোনো মৃত্যু যেন থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী। দেশের কাছে এই কর্মবীরের মৃত্যুও ছিল থাই পাহাড়ের মতো ভারী ও বেদনাবিধুর। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন যে সার্থক জীবন তিনি উদ্যাপন করে গেছেন, যে মহত্ত্ব তার কীর্তির সৌধরাজি থেকে ঠিকরে বের হয়, প্রতিনিয়ত আমাদের পথ দেখায়, অনুপ্রেরণা দেয়, সেই মহত্ত্ব কেউ তাকে দয়া করে দান করেনি, কেউ তার ওপর চাপিয়ে দেয়নি। তিনি নিজে যেমন মহান হয়ে জন্মেছিলেন তেমনই তার অনুপম কীর্তির ভেতর দিয়ে অর্জন করেছিলেন কালজয়ী মহত্ত্ব।
তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অত্যাশ্চর্য পরশপাথর। ভীরুরা তার স্পর্শে পরিণত হয়েছিল সাহসী মানুষে। আড়ষ্ট, অসাড় মানুষ পরিণত হয়েছিল কর্মদক্ষ বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে। মনীষী কার্লাইনের ভাষায়, এ রকম মহাপ্রাণ মানুষ একটি জাতির জন্য হয়ে ওঠেন ক্ষমতাপ্রাপ্ত পথপ্রদর্শক। তারা জ্ঞানী, তাই তো সঙ্গীজনদের ওপর তারা অবলীলায় কর্তৃত্ব করেন। এটা তাদের সহজাত স্বতঃস্ফূর্ত বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশ তো গত বছরগুলোতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানবসৃষ্ট নৈরাজ্যে হয়েছে লন্ডভন্ড। দেশ চলে গিয়েছিল ঋণখেলাপি, টাকা পাচারকারী ও শেয়ারবাজার লুণ্ঠনকারীদের হাতে। এ দেশে ডাকাতি ও তাস্কর্য না করলে যেন কেউ সম্পদশালী হতে পারে না। আবার এসব দূষিত নিকৃষ্ট প্রজাতির দস্যুরাই রাষ্ট্রের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে লিলিপুট থেকে পরিণত হয়েছিল দানবে। এসব দেশদ্রোহী, অর্থনীতি ধ্বংসকারীদের গলিত বিষাক্ত পুঁজির স্রোতের বিরুদ্ধে আশ্চর্য ব্যতিক্রম বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম। আশ্চর্য এবং তুলনাহীন। তিনি যেন লুণ্ঠিত ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিবাদ। তিনি এসব অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে যেন ছিলেন একজন সৎ, সাহসী, দৃঢ়চেতা, অনমনীয়, অভ্রান্ত, অবিচল ভ্রুক্ষেপহীন হিমালয়। সব রকম চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির মুখে দেশ ও জনগণের ভরসার স্থল। তিনি অন্যায়ের সঙ্গে, অসত্যের সঙ্গে কখনোই আপস করেননি। তিনিই সম্ভবত দেশের একমাত্র শিল্প সম্রাট, যার একটি টাকাও ঋণখেলাপি ছিল না। তিনিই একজন মানুষ দেশের বাইরে যার একটি টাকাও পাচার হয়নি। তিনি যে স্বপ্ন দেখেছেন, যা কিছু অর্জন করেছেন সবই তার প্রিয় মাতৃভূমিকে কেন্দ্র করে, দেশের জনগণকে ভালোবেসে। মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ প্রতিফলন ছিল তার সব কর্মে। শিল্প সাম্রাজ্য বিস্তার করে, ব্যাপক বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তিনি দেশকে এগিয়ে দিয়ে গেছেন অনেকটা পথ। দক্ষিণ এশিয়ার জলাভূমির মতো একটি দেশের মানুষের মধ্যে তার মতো এত বড় বড় স্বপ্ন দেখা এবং তা বাস্তবায়ন করে দেখানো-সত্যিই এক পরমাশ্চর্য ঘটনা।
আমাদের শিল্প জগতের মুকুটহীন সম্রাট বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম আজ আমাদের নয়ন সম্মুখে নেই। কিন্তু তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন নয়নের মাঝখানে। আমাদের হৃদয়ে হৃদয়ে অনুরণিত তার কীর্তির ছায়াছবি। আজ তার ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। এই বেদনাঘন সময়ে মনপ্রাণ দিয়ে কামনা করছি তার রুহের মাগফিরাত, আর এই মৃত্যুহীন মহাপ্রাণের প্রতি জানাচ্ছি হ্যাটখোলা কুর্নিশ।
আরো পড়ুন : ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের হাত থেকে জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে পলাশবাড়ীতে প্রবাসীর সংবাদ সম্মেলন
