আমাদের দেখভাল করতো মাসুদুর, এখন আমার কাঁধেই তার স্ত্রী-সন্তানদের দায়িত্ব

অনুসন্ধানী আইন-আদালত ইতিহাস-ঐতিহ্য ওকে নিউজ স্পেশাল ক্রাইম নিউজ জনদুর্ভোগ জাতীয় তথ্য-প্রযুক্তি ধর্ম পুরুষ প্রচ্ছদ মুক্তমত শিক্ষা হ্যালোআড্ডা

‘যার হাত ধরে আমাদের চলার কথা, তাকেই কবর দিতে হয়েছে। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু এতটা অসহায় কখনো হইনি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছি, কাজ করতে পারি না, আমাদের দেখভাল করতো সে। অথচ এখন আমার কাঁধেই মাসুদুরের স্ত্রী-সন্তানদের দায়িত্ব। আর ক’দিন পর আমিও থাকবো না, তখন ওদের কী হবে?’ কথাগুলো বলছিলেন ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ মাসুদুর রহমানের বৃদ্ধ পিতা ওলি উল্লাহ।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী মাদ্রাসা শিক্ষক হাফেজ মাসুদুর রহমান মানিক (৪১) শহীদ হওয়ায় নিদারুণ অসহায় পরিস্থিতিতে পড়েছে তার স্ত্রী, তিন মেয়ে এবং বৃদ্ধ মা-বাবাসহ পুরো পরিবারটি। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার মাসুদুর রহমান ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। রাজধানীর বাড্ডায় স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। মাদ্রাসাতুল রহমানিয়া ইসলামিয়া নামে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। সেই শান্ত স্বপ্নভরা জীবন এক নিমিষে থেমে যায় ১৯শে জুলাইয়ের দুপুরে। তার মৃত্যুর পর নিঃস্ব হয়ে পড়ে পরিবারটি। বাধ্য হয়ে ঢাকা ছেড়েছে তার পরিবার। মাসুদুর রহমান মানিকের বৃদ্ধ বাবার চোখে-মুখে এখন বিষাদের ছাপ। তিন মেয়েকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় স্ত্রী তাসনিম আক্তার (৩০) আশ্রয় নিয়েছেন শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে।

জুমার নামাজ আদায়ের কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি মাসুদুর। জুলাই অভ্যুত্থানে আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট ছিল রাজধানী ঢাকার বাড্ডা, রামপুরা এলাকা। এ এলাকায় অবস্থান নেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশে থাকা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা।  জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে সড়কে লুটিয়ে পড়েন মাসুদুর। পরে তাকে বাড্ডা এমজেড হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৯ জুলাই দুপুরে নামাজ শেষে বের হন তিনি । হাতিরঝিল গুধারাঘাট এলাকা থেকে বের হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি মিছিলে যোগ দেন। সে মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন হাফেজ মাসুদুর রহমান মানিক। পরদিন ২০ জুলাই তাকে দাফন করা হয় গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া পৌর এলাকার অর্জুনতলা গ্রামে।

রাত ৮টার দিকে তার মৃত্যুর সংবাদ পায় পরিবার। ফোনে খবর পেয়েই ভেঙে পড়েন স্ত্রী তাসমিনা আক্তার। পরিবারের সমস্ত সমীকরণ উল্টে যায় নিমিষেই। শুধু সেখানেই শেষ নয়, হাসপাতাল থেকে লাশ বের করতে পারছিলেন না তারা। প্রতিটি মোড়ে অবস্থান নেয় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আহত নিহতদের পরিবারের খোঁজ পেলেই চলতো নির্যাতন। অনেক কষ্টে মধ্যরাতে হাসপাতাল থেকে লাশ বের করতে সক্ষম হয় তার পরিবার।

মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে স্ত্রীকে ফোন করে মাসুদ বলেছিলেন, টেনশন কইরো না, উপরে আল্লাহ আছে, আমার কিছু হবে না। সেই ছিল শেষ কথা। তারপর রাতে ফোন এলো, মৃতদেহ পড়ে আছে হাসপাতালে।

তাসমিনা আক্তার বলেন, তিন মেয়ে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাচ্ছি, তা আল্লাহই ভালো জানেন। লেখাপড়ার খরচ দিতে পারছি না, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসে না। এভাবে কতোদিন টিকে থাকতে পারবো আল্লাহই ভালো জানেন। নিজের মেয়েদের নিয়ে মাসুদুরের স্বপ্ন ছিল- একটি মহিলা মাদ্রাসা গড়ে তুলবেন, সেখানে তার মেয়েরা একদিন শিক্ষকতা করবে। বড় মেয়ে মাহমুদা বাবার হাত ধরেই কোরআন শিখেছিল, হাতেখড়ি হয়েছিল খেলাধুলাতেও। বড় মেয়েটা এখনো বাবার হাত ধরে পড়ালেখার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছে। বাবার না থাকার শূন্যতা আর কান্না মিলিয়ে প্রতিটি দিন কাটে তাদের। কতো করে বলেছিলাম ঢাকার পরিস্থিতি ভালো না, বাইরে বের হইও না, তোমাকে ছাড়া আমাদের কেউ নেই। আমাদের কথা শুনলে আজকে এই দিন দেখতে হতো না বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

তাসমিনা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, দেশের জন্য শহীদ হয়েছে মাসুদুর। কিন্তু আমরা এখনো দেশের কোনো সাড়া পাইনি। কেউ আমাদের কথা ভাবে না, কেউ ফিরে তাকায় না। শুধু কষ্টই আমাদের নিত্যসঙ্গী। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে বলেছে, প্রতি মাসে কিছু টাকা দিবে সেগুলো এখনো পাইনি। খুব বেশি চাওয়ার কিছু নেই শুধু সংসার খরচ চলার মতো একটা ব্যবস্থা হলেই চিন্তামুক্ত হবো। ঢাকায় জামায়াত থেকে ১ লাখ টাকা সাহায্য পেয়েছি। তিনি বলেন, যে বাংলাদেশের জন্য মাসুদুর শহীদ হয়েছিল, সে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ আমরা পাইনি। এখনো সব কিছু আগের মতোই, কোনো কিছুরই পরিবর্তন হয়নি। আমরা দেশের পরিবর্তন চাই, শহীদদের রক্ত বৃথা যাক- এটা চাই না।

আরো পড়ুন : শাহরিয়ার’র স্মৃতি মন থেকে মুছতে পারেননি বাবা-মা! এখনো ভাইকে খুঁজছে একমাত্র বোন!

Share The News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *