ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে’র ক্ষত শুকানোর আগেই ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এর নতুন শঙ্কা

জনদুর্ভোগ জাতীয় প্রচ্ছদ হ্যালোআড্ডা

রবিবার সকাল থেকে রোদের দেখা নেই। ভোর থেকে বিরতিহীন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ঝরছে। কখনো অন্ধকার, কখনো হালকা কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে দক্ষিণের উপকূল। সঙ্গে দমকা ঝোড়ো বাতাস।

সেই বাতাসে বাঁধের ঝুপড়ি ঘর নড়ে উঠলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে সাগরতীরের বাসিন্দাদের। কারণ বছরখানেক আগেও ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে মাথার ওপরের ছাউনি উড়ে যায়। এখনো সেই ক্ষত শুকায়নি উপকূলে।

ইয়াসে উপকূলে অনেকের ঘর ভেঙে গিয়েছিল। ঝুপড়ি ঘরে নতুন করে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হয়েছিল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ফের ঘূর্ণিঝড়ের সিত্রাং-এর অশনিসংকেত।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আন্দামান সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি নিম্নচাপ থেকে এখন গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এটি আজ রবিবার রাতে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান এ বিষয়ে বলেছেন, গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে-এটা মোটামুটি নিশ্চিত বলা যায়। এটি ‘সুপার সাইক্লোন’ হতে পারে।

তিনি বলেন, সোমবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাতের পর থেকে মঙ্গলবার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে।

নতুন দুর্যোগে বেড়েছে চিন্তা: উপকূল ঘুরে জানা গেছে, আকাশে কালো মেঘ ঘনালে উপকূলবাসীর চোখেমুখেও মেঘ ঘনায়। ফের কষ্টের ফসল লবণপানিতে নষ্ট হয়ে যাবে না তো! আশঙ্কায় ফ্যাকাসে মুখ কৃষকের।

২০২০ সালে আম্ফান, ফণী। তারপর ইয়াস। একের পর এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। এখন নতুন ঘূর্ণিঝড়ের আভাস উপকূলের মানুষদের ভাবিয়ে তুলছে।

আগের ঘূর্ণিঝড়ে সব তছনছ হয়ে যায়। সামান্য কিছু ত্রাণ ছাড়া আজও জোটেনি সরকারি ক্ষতিপূরণ। জোড়াতালি দিয়ে সামলে ওঠার চেষ্টা চলছে এখনো। ফের ঘূর্ণিঝড়ে যদি সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় তাহলে আর বাঁচার উপায় থাকবে না।

ধানক্ষেতে কীটনাশক ছিটানোর কাজ করছিলেন কলাপাড়ার আমির হোসেন। ক্ষেতে কাজ করতে করতেই এমন আশঙ্কার কথা শোনালেন মধ্য বয়সের আমির। তাঁর কথা, ‘আতঙ্ক তো হবেই। আগের অভিজ্ঞতা তো ভালো নয়। তাই এখন বাঁচব কি মরব আল্লাই জানেন। হুনছি ঝড় আইবে। ’

চরমোনতাজের বউবাজারের এক জেলে দেখালেন কিভাবে ইয়াসে গোটা ঘর উল্টে পড়েছে পাশের ফাঁকা জায়গায়। তারপর কোনো রকমে দড়ি দিয়ে বেঁধে সেটাকে আটকে রেখেছেন। আপাতত সেখানেই স্ত্রী, সন্তান এবং বয়স্ক বাবা-মাকে নিয়ে দিন কাটছে। গোটা পাড়ায় চারদিকেই শুধু ইয়াসের ক্ষত।

ইয়াসের সময় কয়েক দিন বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন কেউ কেউ। পরে ফিরে দেখেন বাড়ির অস্তিত্বটুকু নেই। ইয়াসের ক্ষতি বাবদ সরকারি ক্ষতিপূরণ আজও জোটেনি গ্রামের অনেকেরই।

গ্রামের সুরুজ মিয়া নদীতে মাছ ধরে সংসার চালান। তিনি বলেন, ‘আগের ঝড়ে এত ক্ষতি হলেও ত্রাণ ছাড়া সরকারিভাবে একটা কানাকড়িও জোটেনি। এবার কী হবে, ভেবে আতঙ্কে আছি। ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোথায় যাব?’

সিত্রাং আশঙ্কায় বুকে কাঁপছে চরমোনতাজের আন্ডারচরের বাসিন্দাদেরও। দুই বছর আগে আম্ফানে পুরো বাড়ি ভেঙে যায় শরীফ শিকদারের। পেশায় জেলে শরীফ বলেন, ‘আম্ফান ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকাও জোটেনি আজও। প্রশাসন আর জনপ্রতিনিধিদের কাছে অনেক ঘুরেছি। সব জায়গাতেই শুনতে হয়েছে অপেক্ষার কথা। ‘

যত ঝড়, তত ক্ষতি: আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এই শতাব্দীর মধ্যে ২০০৭ সালে সবচেয়ে ভয়ানক ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে। এর দুই বছর পর ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এরপর ২০১৩ সালে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন আঘাত করে। এক বছর বিরতি দিয়ে ২০১৫ সালে কোমেন, ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু, ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় মোরা, ২০১৮ সালে ঘূর্ণিঝড় তিতলির আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয় উপকূল। পরের বছরগুলোতে যথাক্রমে ঘূর্ণিঝড় ফণী, আম্ফান, ইয়াস উপকূলে আঘাত হানে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সাল থেকে উপকূলে প্রায় প্রতিবছর একটি করে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিল ২০২১ সালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। তার প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বেশি উঁচু জোয়ার হয়েছিল। তাতে দুই হাজার ৯৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা নাসাসহ বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলো ইয়াসকে সুপার সাইক্লোন হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে ঝড়টি বাংলাদেশে আঘাত হানার আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও সুন্দরবনে আঘাত হানায় তা দুর্বল অবস্থায় উপকূলে পৌঁছায়। ফলে সিডর বা আইলার মতো উপকূলের এটি তেমন ক্ষতি করতে পারেনি।

সিত্রাং মোকাবেলায় প্রস্তুতি: বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ মোকাবেলায় বিভাগের চার হাজার ৯১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। যার মধ্যে বরিশাল জেলায় এক হাজার ৭১টি , পটুয়াখালীতে ৯২৫, ভোলায় এক হাজার ১০৪, পিরোজপুরে ৭১২, বরগুনায় ৬২৯ এবং ঝালকাঠিতে ৪৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য মতে, এ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ২০ লাখ মানুষের পাশাপাশি কয়েক লাখ গবাদি পশুকেও স্থান দেওয়া যাবে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসন সম্মেলনকক্ষে এ ব্যাপারে আজ (রবিবার) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আরো পড়ুন : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এক হাজার ৩৪ জন, মোট মৃত্যু ১১৩ জন

Share The News

Leave a Reply

Your email address will not be published.