জেনে নিন আওয়ামী লীগের নতুন কমিটির কোন সাত চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে হবে

জনপ্রতিনিধি প্রচ্ছদ মুক্তমত রাজনীতি হ্যালোআড্ডা

আন্দোলন মোকাবিলা । কূটনৈতিক চাপ সামলানো । দলীয় কোন্দল নিরসন । জঙ্গিবাদ-সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনমত অর্জন। সংসদ নির্বাচনে জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাই । অপপ্রচারের জবাব । বিএনপিসহ নিবন্ধিত সব দলকে নির্বাচনমুখী করা

আওয়ামী লীগের ৮১ সদস্যের কার্যনির্বাহী সংসদের ৪৮ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এতে নতুন কোনো মুখ নেই। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর বাকি থাকতে পুরনো ও অভিজ্ঞদের ওপরই আস্থা রেখেছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

গত শনিবার দলের ২২তম জাতীয় কাউন্সিলে টানা দশমবারের মতো সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে প্রেসিডিয়াম, সম্পাদকমন্ডলীর সদস্যদের নাম ঘোষণা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সামনে নির্বাচন। তাই দলে বড় পরিবর্তন আনতে চাই না। আওয়ামী লীগের জনসমর্থন আছে। তবে ভোটার আনতে হবে। দল সংগঠিত না হলে সেটা হবে না। সদস্য সংগ্রহ অভিযান বাড়াতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘অভিজ্ঞ’ এই নতুন কমিটিকে সাতটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে- সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলা করা, কূটনৈতিক চাপ সামলানো, দলীয় কোন্দল নিরসন, জঙ্গিবাদ-সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনমত, সংসদ নির্বাচনে জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাই, সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সরকারবিরোধীদের অপপ্রচারের যৌক্তিক জবাব এবং বিএনপিসহ নিবন্ধিত সব দলকে নির্বাচনমুখী করা। মোটামুটি এই সাত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা থাকবে বলে রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

গতকাল সকালে নতুন কমিটি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আগামী নির্বাচন, বিশ্ব পরিস্থিতি সামনে রেখে আমাদের দেশেও সংকট আছে। জঙ্গিবাদ সম্প্রদায়িকতা, বিএনপির নেতৃত্বে সরকার হটানোর আন্দোলন, এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ। তা মোকাবিলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অভিজ্ঞদের রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলের সভানেত্রী।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, টানা ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড যেমন দৃশ্যমান, তেমনি টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা। এর মধ্যে দলীয় কোন্দল একটি বড় সমস্যা। তৃণমূল এখন হাইব্রিডের দখলে। নেতৃত্বের ‘অসুস্থ’ প্রতিযোগিতা প্রতিহিংসায় পরিণত হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই একে অন্যের খুনোখুনির শিকার হচ্ছেন। প্রায় অধিকাংশ আসনেই ‘আওয়ামী লীগ বনাম এমপি লীগ’ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে। নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপে এ সংকট বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এগুলো নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে। আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করা গেলে সংকট অনেকটা দূর হবে। এ দলের টানা উন্নয়নের ফলে সমর্থন বাড়লেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম। আগামীতে ভোটার টানার তাগিদ দিয়েছেন দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত শনিবার দলের ২২তম জাতীয় সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনে সভানেত্রীর কাছে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে অভিযোগ তোলেন তৃণমূল নেতারা। তারা বলেন, ১৪ বছর দল ক্ষমতায়। আমরা দলকে বুকে লালন করে চলেছি। কেউ কেউ দল-অন্তঃপ্রাণ হিসেবে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছেন। অথচ কেউ কেউ দল বিক্রি করে খাচ্ছেন। আশা করব দলকে যারা লালন করেন, পালন করেন আগামী নির্বাচনে তাদের মূল্যায়ন করবেন। নির্বাচনে নৌকা যেন ভাড়া না দেওয়া হয় সে দাবি করেন তারা। তবে কাউন্সিল অধিবেশনে তৃণমূল নেতাদের করা অভিযোগের নোট নিয়েছেন দলটির সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে প্রত্যয় ঘোষণা করেছে সেজন্য আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আসতে হবে এবং দেশের উন্নয়নের হাল শেখ হাসিনার হাতে দিতে হবে। এ জন্যই আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্বকে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।

বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। তারা বিভাগীয় সমাবেশ, গণমিছিলসহ নানা কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনে শামিল হচ্ছে ডান-বামপন্থী দলগুলোও। ১০ ডিসেম্বর সরকার পতনের বড় হাঁকডাক দিলেও শক্ত হাতেই সামাল দিয়েছে আওয়ামী লীগ ও সরকার। নতুন বছরে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে পারে বিএনপিসহ তাদের সমমনা ডান-বামপন্থী দলগুলো। এ আন্দোলন শক্ত হাতে দমন করাও আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ চায় দেশের উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রগুলো। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চেয়ে প্রায়ই বিভিন্ন বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে। একটি প্রভাবশালী দেশের কূটনীতিক বেশ তৎপর। ভোট, গণতন্ত্রসহ নানা ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসাই এখন ক্ষমতাসীন দলের নতুন নেতৃত্বের জন্য আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতসহ অগণতান্ত্রিক দলগুলো সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ ও সরকারের বিরুদ্ধে নানামুখী অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও গুজব ছড়িয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। বিদেশিরা যেন সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান করেন, সেজন্য তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছে।’

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের ফলে তা নিষ্ক্রিয় হয়। নির্মূল হয়েছে এমন দাবি কেউ করছে না। সম্প্রতি ঢাকার আদালতপাড়া থেকে দন্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তারা এখনো ধরা পড়েনি। ফলে এক ধরনের ভীতি রয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে যেন জঙ্গিবাদ সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য গ্রামগঞ্জে-পাড়া মহল্লায় ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে হবে।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নতুন কমিটির সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এরমধ্যে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস-নৈরাজ্য মোকাবিলা করা। বিশ্ব মন্দার ফলে অর্থনীতি স্থিতিশীলতা রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে সরকারকে সহায়তা করা। আর দেশবিরোধী অপপ্রচারের জবাব দেওয়া এবং আওয়ামী লীগকে টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আনাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।’

দেশ-বিদেশ থেকে ভুয়া আইডি খুলে সরকারবিরোধী অপপ্রচার চলছে। এর তুলনামূলক সঠিক যৌক্তিক জবাব দিতে পারছে না আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। বারবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তা কাজে লাগেনি। বরং যেসব নেতা-কর্মী ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ব্যবহার করছেন, তাদের অধিকাংশই আত্মপ্রচারে ব্যস্ত। আর সহযোগী সংগঠনের নেতারা ‘ভাই’ বন্দনায় সময় পার করছেন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও আওয়ামী লীগের নতুন কমিটির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক বছর বাকি। এবারের নির্বাচন গত দুই নির্বাচনের মতো হবে না- অনেক আগে থেকেই দলীয় নেতা-কর্মীদের সতর্ক করছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তৃণমূলে সব থেকে গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ইমেজের প্রার্থী বাছাই করাও আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়াও নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে এনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসাও আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সেটি দেশের ভিতর ও বাইরে প্রশংসিত হবে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হব। কারণ শেখ হাসিনার সততা, দক্ষতা, দূরদর্শিতা, মেধা দিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছে, আগামীতেও থাকবে।’

আরো পড়ুন : এক মাস সাগরে নৌকা যাত্রা করে ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে ৫৮ রোহিঙ্গা

Share The News

Leave a Reply

Your email address will not be published.