হংকং শহরে অসহায়ত্বের জীবন বাংলাদেশি শরণার্থী দম্পতির

প্রচ্ছদ প্রবাস লাইফ স্টাইল হ্যালোআড্ডা

লেখা: আল–জাজিরা, হংকং: হংকংয়ের শাম সুই পো। শহরতলি এ এলাকায় শ্রমজীবী পরিবারগুলোর বাস। সেখানে ছোট্ট একটি বাড়িতে (মূলত ঘর) দুই সন্তান ও স্ত্রী আক্তারকে নিয়ে থাকেন রানা (ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় তাঁদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হলো)। ঘরের মতো সেই বাড়িটির দেয়ালে হেলান দিয়ে জরাজীর্ণ জানালায় চোখ রেখে নিঃসঙ্গ বসে আছেন ৪১ বছর বয়সী রানা। তাঁর চোখে রাজ্যের হতাশা।

রানার এক পা ফুলে মোটা হয়ে আছে। দেয়ালের কোণে পা ঠেস দিয়ে রেখেছেন তিনি। রানা বললেন, ‘আমি একটি নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করছিলাম। এ সময় ওপর থেকে কিছু যন্ত্রপাতি ও ইস্পাতের একটি গার্ডার ধসে আমার পায়ের ওপর পড়ে। এতে করে গুরতর আঘাত পাই। তবে আমি সৌভাগ্যবান পা–টা হারাতে হয়নি।’

যাঁরা বসবাসের জন্য হংকংয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, কয়েক দশক ধরে তাঁদের মারাত্মক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কুঠুরির মতো ছোট ছোট ঘরে থাকতে হচ্ছে তাঁদের। কাজ করার ওপর দেওয়া আছে নিষেধাজ্ঞা। এতে করে দুবেলা খেয়ে দিনযাপন করাই কষ্টসাধ্য হয়েছে।

রানা সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। এ বিষয়ে রানা বলেন, তাঁর পরিবারের আর্থিক দুর্দশার কারণে নিরুপায় হয়ে কাজ করতে শুরু করেছিলেন।

রানা বলেন, ‘বেআইনি জানা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যে আমাকে কাজ করতে হয়। এ কাজের জন্য নিয়মমাফিক বেতন পাওয়া যায় না। হংকংয়ে আশ্রয় প্রার্থী যাঁরা, এভাবে কাজ করে তাঁরা দিনে মাত্র ৫ ডলার পান। সেটাও ই–কার্ডের মাধ্যমে খাবার দিয়ে পরিশোধ করা হয়। বাস্তব অর্থে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর হংকংয়ে এখন আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন।’

বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি এখন আকাশচুম্বী। খাবার থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ও পোশাক পর্যন্ত সবকিছুর দাম অনেক বেড়ে গেছে। এ আয়ে আশ্রয়প্রার্থীরা দৈনন্দিন খাবারই জোটাতে পারেন না। এ ছাড়া হংকংয়ে আশ্রয়প্রার্থী বিভিন্ন দেশের বাসিন্দাদের সরকার যে ভাতা দেয়, ২০১৪ সালের পর থেকে তা একেবারেই বাড়েনি।

হংকংয়ে রিফিউজি ইউনিয়ন নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আছে। শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীরাই এটি চালান। সেই প্রতিষ্ঠানের করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, গেল বছরে সেখানে কিছু কিছু খাদ্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। জাস্টিন সেন্টার নামে আরেকটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) পৃথক একটি বিশ্লেষণে দেখা যায় যে স্থানীয় খাবার লেটুসের দাম চার গুণ বেড়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে হংকংয়ে ভোগ্যপণ্যের দাম এতটা বেড়েছে যে ২০১৫ সালের পর আট বছরে যেটা সর্বোচ্চ।

বাড়ির ছোট্ট একটি বারান্দা থেকে নিচে রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রানার স্ত্রী আক্তার বললেন, ‘আমাদের ঘরে কোনো খাবার নেই।’

দুঃসহ জীবন
এই দম্পতি দুই সন্তান নিয়ে ছোট্ট যে ঘরে থাকেন, তার আয়তন মাত্র ২০০ বর্গফুট। তাঁরা যে ভবনে থাকেন, সেটি ‘কফিন বাড়ি’ নামে পরিচিত। এই নাম দেওয়ার কারণ সেখানে প্রতিটি পরিবার যে বাড়িতে থাকে, তার আয়তন একটি কফিনের মতো। ভবনের নিচ থেকে সারা দিন হকারদের চিল্লানোর আওয়াজ ভেসে আসে। কারণ, নিচের রাস্তায় এসব হকার ‘কালোবাজার’ থেকে কেনা পণ্য বিক্রি করেন। বয়স্ক নারীরা সেই রাস্তায় মাদুর পেতে সেসব পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন।

প্রথমদিকে দুঃখভরা মন নিয়ে কথা বললেও একটা সময় আক্তারের কণ্ঠে বিরক্তি স্পষ্ট হতে থাকে। এভাবে জীবনযাপনের ‘অভিশাপ’ নিয়ে বেঁচে থাকার বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এখানে সবকিছুর অনেক দাম। সবকিছু মানে সবকিছু। আমাদের বাড়িও বিক্রি করতে হয়েছে। সরকার পর্যাপ্ত ভাতাও দিচ্ছে না।’

কয়েক বছর আগে যখন আর্থিক দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে, তখন পরিবারের জন্য দুবেলা খাবার জোটাতে রানা বাধ্য হয়ে নির্মাণাধীন ভবনে বেআইনিভাবে কাজ করতে শুরু করেন। তবে এতে ঝুঁকি অনেক। এভাবে কাজ করতে গিয়ে ২০১৮ সালে তিনি আটক হন। এরপর ১৩ মাস একটি ‘সংশোধনাগারে’ থাকতে হয়।

গত বছরের নভেম্বরে রানা আবার কাজ শুরু করেন। এরপরই গার্ডার ধসে আহত হন তিনি। এবার আহত হয়ে কাজ তো করতে পারেন না এমনকি হাঁটাচলাও করতে পারছেন না। হয় কাজ করতে হতো, নয়তো পরিবার নিয়ে অনাহারে থাকতে হতে জানিয়ে রানা বলেন, ‘আমি এটা করতে চাইনি। কিন্তু আমরা নিরুপায়।’

আক্তারের বয়স এখন ৩২ বছর। দুই বছর ও ছয় মাসের দুটি শিশুসন্তান রয়েছে তাঁদের। সন্তানদের দিয়ে দুঃসহ এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানেরা ছোট। তারা খেতে পাবে কি না, এ নিয়ে চিন্তায় থাকি। খাবারের অনেক দাম। আমরা শাকসবজিও কিনতে পারি না।’

যেভাবে হংকংয়ে তাঁরা
বাংলাদেশে থাকতে ধর্ষণের শিকার হন আক্তার। এরপর তাঁর পরিবার তাঁকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ২০১৭ সালে তিনি পালিয়ে হংকংয়ে যান। ওই সময় আক্তারের মনে হয়েছিল হংকংয়ে গেলে অনেক সুবিধা পাবেন। নতুন করে জীবন শুরুর আশায় ‘বিদেশে’ পাড়ি জমান। হংকংয়ে ঢুকে আশ্রয় চান। তাঁর এ ধারণা ছিল যে হংকং বিশ্বের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ একটি শহর। সেখানে কাজের অভাব হবে না। তবে নতুন এ জীবনে অভ্যস্ত হতে কিছুটা সময় লেগে যায়। প্রথমে দুই বছর তাঁর জন্য ছিল সবচেয়ে কষ্টের। আক্তার বললেন, এই সময়ে একা একা রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন আর কাঁদতেন। দুবেলা খাবারও খেতে পারতেন না।

রানা রাজনৈতিক শরণার্থী। বাংলাদেশে বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ জন্য হুমকির মুখে ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে হংকংয়ে যান ২০১৬ সালে। এরপর আরও দু–একটি দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। রানা বললেন, ‘আমি এখন আর দেশে ফিরতে পারছি না। আবার এভাবে থাকতেও পারছি না।’

হংকংয়েই রানা ও আক্তারের পরিচয়। পরিচয় থেকে প্রেমে পড়েন তাঁরা। এরপর বিয়ে করেন তাঁরা। দুই সন্তান নিয়ে হংকংয়ে দুঃসহ দিন যাচ্ছে তাঁদের। রানা বলেন, ‘আমার এমন কোনো বন্ধু নেই যে আমাকে সাহায্য করবে।’ তাঁর মতো হংকংয়ে আশ্রয়প্রার্থী অন্যদের সম্পর্কে বললেন, ‘এখন সবার অবস্থা একই।’

শরণার্থীদের জীবন
হংকংকে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম একটি কেন্দ্র বলা হয়। জাঁকজমক আর জৌলুশের জন্য খ্যাতি আছে শহরটির। তবে একই সঙ্গে সেখানে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে বৈষম্য অনেক। অসমতার শহরের তালিকায় উপরের দিকে আছে হংকং। তবে সেখানে আশ্রয়প্রার্থী ও প্রান্তিক মানুষের জন্য বেঁচে থাকার উপায় একেবারে সীমিত।

হংকংয়ে আনুমানিক ১৪ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী আছেন এখন। এর মধ্যে অধিকাংশের কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া। শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে ১৯৫১ সালে জাতিসংঘের একটি কনভেনশনে ১৪৩ দেশ স্বাক্ষর করলেও হংকং তাতে এখনো সই করেনি। শরণার্থীদের কীভাবে সামলানো হবে, সে বিষয়ে নিজস্ব পদ্ধতি আছে হংকংয়ের।

নির্দিষ্ট শর্তে অল্প কিছু আশ্রয়প্রার্থী ছয় মাস কাজ করার অনুমতি পান। তবে এ সংখ্যাও একেবারে কম। হংকংয়ের অভিবাসন বিভাগের হিসাবে, ২০০৯ সাল থেকে আশ্রয়ের আশায় সেখানে গিয়ে কাজ করার অনুমতি পেয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা মাত্র ২৯১। আর এর প্রক্রিয়াটাও অনেক দীর্ঘ। কয়েক বছর সময় লাগে।

হংকং সরকারের হিসাবে, ২০১৪ সাল থেকে কাজের জন্য অনুমতি চেয়ে যেসব আশ্রয়প্রার্থী আবেদন করেছেন, তাঁদের মধ্যে এক শতাংশের কম কাজের অনুমতি পেয়েছেন। বিভিন্ন জটিলতার কারণে ৬৫ শতাংশের আবেদন ঝুলে আছে। এ জন্য হংকংয়ে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীরা চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছেন।

রানার কথায় তা স্পষ্ট। তিনি বললেন, ‘আমি একটা ভবিষ্যৎ চাই। কারণ, এখন আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’ এ কথা বলার সময় রানার চোখ ছলছল করছিল।

সুত্র: প্রথম আলো

আরো পড়ুন : আজ ৩ জানুয়ারি কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের মৃত্যুবার্ষিকী

Share The News

Leave a Reply

Your email address will not be published.