এখন করোনায় আক্রান্ত রোগ প্রতিরোধহীন ব্যক্তিরা ঝুঁকিতে

জাতীয় প্রচ্ছদ স্বাস্থ্য কথা

দেশে করোনার তেজ এখন একেবারেই কম। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার বেশ কয়েক দিন ধরে রয়েছে ১ শতাংশেরও নিচে। আগের সপ্তাহের চেয়ে গত সাত দিনে রোগী শনাক্ত কমেছে ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ, আর মৃত্যু কমেছে ৭৫ শতাংশ। গত ১১ দিনে সব মিলিয়ে আক্রান্ত হয়েছে পাঁচ শতাধিক মানুষ। সেই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত হচ্ছে ৫০ জনেরও কম। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে দু’জনের। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, স্বল্পসংখ্যক মানুষ যারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন- তারা কারা?

এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন কারা আক্রান্ত হচ্ছেন- এটি আমারও প্রশ্ন।
তবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, ক্যান্সারসহ নানা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তখন করোনার মতো ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে বয়স্ক মানুষের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি। তবে সংক্রমিত ব্যক্তিদের তথ্য-উপাত্ত সরকারিভাবে পর্যালোচনা করলে একটি বাস্তব চিত্র উঠে আসবে। তখন সংক্রমিত হওয়ার কারণগুলো বের হবে, এটি হওয়া প্রয়োজন। তাহলে ভবিষ্যতে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা সহজ হবে।’

সংক্রমণ কমে আসার পেছনে একটি কারণ উল্লেখ করে ডা. নজরুল বলেন, ‘দেশে কয়েক ধরনের ভাইরাস আছে। ওই ভাইরাসগুলোর মধ্যে করোনা সাংঘর্ষিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এটিও করোনা সংক্রমণ কমে আসার একটি কারণ হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে। গবেষণার ফল হাতে এলে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানেও মিলেছে ডা. নজরুলের বক্তব্যের সতত্য। করোনা সংক্রমিত ও মৃতদের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বক্ষব্যাধি, হৃদরোগ, কিডনি, লিভার, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন রোগ (কো-মরবিডিটি) আছে- এমন মানুষ বেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত ব্যক্তিদের অধিকাংশের কো-মরবিডিটি ছিল। এ ছাড়া মারা যাওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি টিকার পূর্ণ ডোজ শেষ করেননি।

৯৯ শতাংশের বেশি রোগী বাসাবাড়িতে :করোনার তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর গত রোববার পর্যন্ত ১৯ লাখ ৫২ হাজার ৬৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। আর মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এক কোটি ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার ২৭৬টি। সংক্রমিতদের মধ্যে ২৯ হাজার ১২৩ জনের মৃত্যু এবং ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪০ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। দেশে বর্তমানে মোট করোনা সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা ৩৪ হাজার ৩০২ জন। তাদের মধ্যে সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় ১৩১ জন, আইসিইউতে ৪০ এবং এইচডিইউ শয্যায় ১৫ জনসহ মোট রোগী ভর্তি আছেন ১৮৬ জন। আর বাসাবাড়িতে অবস্থান করছেন ৩৪ হাজার ১১৬ জন। সব মিলিয়ে শয্যা আছে ১৫ হাজার ৮২টি। অর্থাৎ ৯৯ শতাংশ শয্যা ফাঁকা পড়ে আছে। আর ৯৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ রোগী বাসাবাড়িতে অবস্থান করছেন। হাসপাতালে ভর্তি মাত্র শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ রোগী।

রাজধানীর হাসপাতালেই ৪২ শতাংশ রোগী : সব মিলিয়ে রাজধানী ঢাকায় মোট ৭৯ জন আর সারাদেশে ১০৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। অর্থাৎ মোট ভর্তি রোগীর ৪২ দশমিক ৪৭ শতাংশ রাজধানীর হাসপাতালে। বাকিরা রয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে।

সর্বোচ্চ শনাক্ত ও মৃত্যু ঘটায় ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট :দেশে ২০২০ সালের মার্চে সংক্রমণ শুরুর পর ধাপে ধাপে রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু বাড়তে থাকে। ওই বছরের মধ্যে জুনে সর্বোচ্চ ৯৮ হাজার ৩৩০ জন রোগী শনাক্ত হন। আর সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে জুলাইয়ে। ওই মাসে এক হাজার ২৬৪ জনের মৃত্যু হয়। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ রোগী সুস্থ হয় ডিসেম্বরে ৭৬ হাজার ৭৪৮ জন।
২০২১ সালে দেশে ডেলটা ভ্যারিয়েন্টে সংক্রমণ ছড়ায়। ওই বছরের নভেম্বরে সবচেয়ে কম ছয় হাজার ৭৪৫ জন রোগী শনাক্ত হয়। আর সবচেয়ে কম মৃত্যু হয় ডিসেম্বরে ৯১ জন। একই বছর সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয় জুলাইয়ে। ওই মাসে তিন লাখ ৩৬ হাজার ২২৬ জন রোগী শনাক্ত হয়। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে জুলাইয়ে ছয় হাজার ১৮২ জন। এর বিপরীতে সবচেয়ে বেশি রোগী সুস্থ হয় আগস্টে তিন লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৩ জন।

গত বছরের ডিসেম্বরে আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে। গত জানুয়ারিতে পরিস্থিতি ভয়ানক রূপ নেয়। চলতি বছরের মধ্যে ওই মাসে সর্বোচ্চ দুই লাখ ১৩ হাজার ২৯৪ জন রোগী শনাক্ত হয়। আর মৃত্যু বেশি হয় ফেব্রুয়ারিতে ৬৪৩ জন। মার্চে সংক্রমণ অনেকটাই কমে আসে। মার্চজুড়ে আট হাজার রোগী শনাক্ত হয়। আর মৃত্যু হয় ৮৫ জনের। এপ্রিলে সংক্রমণ আরও কমে এসেছে। এপ্রিলের প্রথম ১১ দিনে রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৫৩০ জন। আর মারা গেছেন দু’জন। এই সময়ে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৬৪ হাজার ১৭২টি।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের : জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, অধিকাংশ মানুষ টিকার আওতায় আসায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভ্যারিয়েন্ট পরিবর্তন না ঘটায় ভাইরাসটিও আগের তুলনায় কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর পরও কিছু মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন। কারণ লক্ষণ-উপসর্গ নেই, তবে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে গিয়ে কেউ কেউ আক্রান্ত হচ্ছেন। আবার রোগী কমে আসায় মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি অধিকাংশ মানুষ এখন মানছেন না। এর ফলেও সংক্রমিত হচ্ছেন। এখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম- এমন ব্যক্তি সংক্রমিত হলে তার লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পাচ্ছে। এমনকি তাদের মধ্যে কিছু মানুষ হাসপাতালেও ভর্তি হচ্ছেন। আবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকার কারণে কেউ কেউ সংক্রমিত হলেও লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পাচ্ছে না। আবার সরকারি হিসাবে সংক্রমিতদের যে তালিকা দেখা যায়, তার তুলনায় অন্তত পাঁচ থেকে ছয় গুণ রোগী বেশি- এটি বিশ্বজুড়ে প্রচলিত হিসাব। তাই বলা যায়, করোনার সংক্রমণ এখনও শেষ হয়নি। এ অবস্থায় সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অন্যথায় বিপদ বাড়তে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশ এক ডোজ টিকাও নেননি। আবার কেউ কেউ প্রথম ডোজ নিলেও দ্বিতীয় ডোজের টিকা নেননি। এ ছাড়া কো-মরবিডিটি ও বয়স্ক জনগোষ্ঠী বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এটি কমিয়ে আনতে হলে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে প্রধান হলো কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করা। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। তাহলে সংক্রমণ আরও কমে আসবে। একই সঙ্গে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দিতে হবে।

আরো পড়ুন : ছোট বিষয়ে ঘটছে বড় ঘটনা; হচ্ছে মার্ডার

Share The News

Leave a Reply

Your email address will not be published.