গ্রামীণ উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা এবং অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে নতুন কাঠামোর মাধ্যমে আগামী বছর দেশে আবারও চালু হতে যাচ্ছে গ্রাম সরকারব্যবস্থা। এ লক্ষ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ লক্ষ্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৮০ সালে এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ২০০৩ সালের আইনের আলোকে একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। শিগগির খসড়াটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে। অবশ্য বর্তমান স্থানীয় সরকার কাঠামোর পাশাপাশি গ্রাম সরকারব্যবস্থা চালুর পক্ষে ও বিপক্ষে চলছে নানা আলোচনা। সরকারপক্ষ বলছে, এই ব্যবস্থা চালুর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানো সহজ হবে এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের মতো কাজে মানুষের ভোগান্তি ও জটিলতা কমবে। অবশ্য সরকারের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। তারা বলছেন, সৎ ও ভালো মানুষ দিয়ে গ্রাম সরকার গঠন করলে ভালো সুফল পাওয়া যাবে। গ্রামের সালিশ ও উন্নয়ন কাজে গতি পাবে। আবার কারও মতে, ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ও ওয়ার্ড পরিষদ বিদ্যমান থাকায় নতুন করে এই সংগঠন তৈরি করলে দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি ঘটবে এবং জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বদলে স্থানীয় পর্যায়ে অহেতুক জটিলতা তৈরি হতে পারে। নতুন করে এই উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক মেরূকরণ বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক বলয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী নেতাদের দৌরাত্ম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার ও সংঘাত-সহিংসতারও আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এটি দুর্নীতি বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকে মত দিয়েছেন।
খসড়ায় যা আছে : প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৮০ সালে চালু হয়েছিল ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’। সেই গ্রাম সরকার ব্যবস্থাপনা ফিরছে তারই সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত দিয়ে। স্থানীয় সরকার বিভাগের তৈরি খসড়াটির ওপর এরই মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত ১২ অক্টোবর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। তখন প্রাথমিক আলোচনা হলেও শিগগিরই আইনের খসড়া আকারে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠবে। খসড়াটির ওপর মতামত নেওয়া হচ্ছে। খসড়া অনুযায়ী, দেশের ইউনিয়ন পরিষদের ৪১,১১২ ওয়ার্ডের প্রত্যেক সদস্য গ্রাম সরকারের প্রধান এবং সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য উপদেষ্টা হবেন। ১৫ সদস্যের মধ্যে থাকবেন গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সমাজসেবক, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, যুব প্রতিনিধি, পল্লিচিকিৎসক, নিকাহ রেজিস্ট্রার, সমবায় সমিতির সদস্য এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিনিধি। সংশ্লিষ্ট এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য থাকলে তাদের প্রতিনিধিত্বেরও প্রস্তাব রয়েছে। সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের অংশগ্রহণে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। এ জন্য ভোটার তালিকায় নাম থাকা ভোটারদের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর। এটি ইউনিয়ন পরিষদের সহায়ক সংগঠন হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত আইনে গ্রাম সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে রাখা হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ প্রতিরোধ। নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক ও জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে সংগঠনটি। পাশাপাশি গ্রামে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায়ও উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এসব কার্যক্রম আইনানুগ কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হবে।
পক্ষে-বিপক্ষে বিশেষজ্ঞদের মত : গ্রাম সরকার নিয়ে জানতে চাইলে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভালো মানুষ দিয়ে যদি গ্রাম সরকার গঠন করা হয় তবে অবশ্যই ভালো হবে। গ্রামের সালিশ বিচার করা এবং উন্নয়নমূলক কাজে গতি পাবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো হবে’। পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘ছোট বেলায় দেখেছি যারা বিচার করতে আসতেন তারা এক গ্লাস পানিও খেতেন না। কিন্তু মাঝে এটাও দেখেছি, টাকা ছাড়া গ্রামে কোনো বিচার হয়নি। গ্রামে যাদের সুনাম আছে, সততা আছে এমন লোক দিয়ে গঠন করলে উপকার হবে। লোক বাছাই করতে ভুল করলে বিএনপির জনপ্রিয়তাও কমবে’। যদিও গ্রাম সরকারের বিপক্ষে মত দিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘গ্রাম সরকার জিয়াউর রহমান যেভাবে করেছিলেন অর্থাৎ গ্রামকে একত্রিত করত সেটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আর কাজে আসবে না বরং গ্রাম বিভক্ত হতে পারে। এতে আশঙ্কা করি, মারামারি কাটাকাটি হবে পশ্চিমবঙ্গের মতো’। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মধ্যে দলাদলি এখন অনেক যা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। হাইকোর্ট থেকে এই পদ্ধতিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। সব মিলে আমি মনে করি, এখন আর এই পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া উচিত নয়’।
সরকার পক্ষের যুক্তি : গ্রাম সরকার পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে প্রস্তুত করা খসড়ায় গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নে গ্রাম সরকার ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে বিএনপি সরকার। রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নির্মাণ বা সংস্কারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং আর্থিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে। শিক্ষা বিস্তার, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহযোগিতা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বাস্তবায়নেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করবে। নিরাপদ পানির সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন, কৃষি উপকরণের সংকট চিহ্নিতকরণ, মৎস্য চাষ, পশুপালন, ক্ষুদ্র শিল্প ও সমবায় কার্যক্রম সম্প্রসারণেও কাজ করবে। গ্রাম সরকার গঠনের মূল লক্ষ্য তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং গ্রামের উন্নয়নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ জোরদার করা বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা সহজ ও নির্ভুলভাবে পৌঁছে দিতে তৃণমূল পর্যায়ে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ওয়ার্ড ও ইউপি পর্যায়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পণ করে জন্ম এবং মৃত্যু নিবন্ধনের কাজগুলো তৃণমূল মানুষের একেবারে কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হবে। এতে সেবা পেতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং ডেটাবেজে ভুয়া ও দ্বৈত এন্ট্রি রোধ করা সম্ভব হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং নারী, শিশু, যুবক ও প্রবীণদের কল্যাণমূলক কার্যক্রমেও ভূমিকা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। খসড়ায় গ্রাম সরকারের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে। প্রতিটি গ্রাম সরকারের নিজস্ব তহবিল থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া অর্থ এ তহবিলে জমা হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি বা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তের পর জেলা প্রশাসক গ্রাম সরকার বাতিল করতে পারবেন। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাম সরকারকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে। কোনো সদস্য যথাযথ কারণ ছাড়া পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকলেও তাকে অপসারণের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশে গ্রাম সরকারব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। পরে ২০০৩ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ‘গ্রাম সরকার আইন’ প্রণয়ন করা হয়। তবে আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন ওঠে। ২০০৫ সালে হাইকোর্ট আইনটিকে অসাংবিধানিক ও অকার্যকর ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে আইনটি রহিত করা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন কাঠামোয় গ্রাম সরকার পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। প্রস্তাবিত আইনটি অনুমোদিত হলে গ্রামীণ উন্নয়ন, অপরাধ প্রতিরোধ ও স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সংগঠনটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর।
আরো পড়ুন : ৯ নভেম্বর, আজকের দিনে জন্ম-মৃত্যুসহ যত ঘটনার
