টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির পর সামনে এসেছে নির্মম এক বাস্তবতা

অনুসন্ধানী অর্থনীতি জনদুর্ভোগ জাতীয় প্রচ্ছদ

উখিয়ার পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির পর সামনে এসেছে ফায়ার স্টেশন ঘাটতির নির্মম এক বাস্তবতা। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, এরমধ্যে পর্যটনের অন্যতম প্রধান করিডর মেরিন ড্রাইভ। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটকের যাতায়াত এই সড়কে। অথচ প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভজুড়ে নেই কোনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। ফলে এ পথে থাকা হোটেল, রিসোর্ট কিংবা অন্য কোনো স্থাপনায় আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের পৌঁছাতেই দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় লাগে। অথচ আগুন ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছে মাত্র কয়েক মিনিট। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তিন মিনিটের মধ্যেই আগুন রিসোর্টের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক কক্ষ ও স্থাপনা পুড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান ১০ জন। ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই আগুনের ভয়াবহতা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, মেরিন ড্রাইভের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন করিডরে জরুরি অগ্নিনির্বাপণ সেবার ব্যবস্থা না থাকার দায় নেবে কে?

শুধু ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের অভাব নয়, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের পর কক্সবাজারে গড়ে ওঠা রিসোর্টগুলোর অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাও আলোচনায় এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, ৯৬৮টি রিসোর্টকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এসব রিসোর্টের বিষয়ে ১ হাজার ৯৬৩টি আবেদন জমা পড়েছে এবং ১ হাজার ৭২৫টির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে অনুমোদন প্রক্রিয়া, বাস্তব অবকাঠামো ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অনুমোদন পাওয়া রিসোর্টগুলোতে বাস্তবে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পর্যটকদের জন্য জরুরি বহির্গমন পথ আছে কি না, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সচল কি না, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রয়েছে কি না কিংবা আগুন লাগলে পর্যটকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মতো প্রশিক্ষিত লোকবল আছে কি না-এসব বিষয় নিয়মিত তদারকি করা হয় কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব বলেন, মেরিন ড্রাইভে দিন দিন পর্যটকের চাপ বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় জরুরি সেবার অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তাঁর মতে, মেরিন ড্রাইভে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও আধুনিক পুলিশ স্টেশন থাকা জরুরি।

এদিকে টুপটুপ রিসোর্টে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় মামলা হয়েছে। রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উখিয়া থানায় দায়ের করা মামলায় চারজনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও দায় নির্ধারণে জেলা প্রশাসনের গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কমিটির তদন্তে আগুনের সূত্রপাতের কারণের পাশাপাশি রিসোর্টটির অনুমোদন, নির্মাণবিধি, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

পর্যটনকে কেন্দ্র করে মেরিন ড্রাইভে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগে একের পর এক রিসোর্ট গড়ে উঠছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ফায়ার সার্ভিস, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, পানির উৎস ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীর ব্যবস্থা না বাড়লে এসব স্থাপনাই মুহূর্তে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড তাই শুধু একটি স্থাপনা পুড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি মেরিন ড্রাইভের জরুরি নিরাপত্তা অবকাঠামো, রিসোর্টের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ১০ জনের প্রাণহানির পর এখন জরুরি প্রশ্ন-মেরিন ড্রাইভে আরেকটি এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কবে?

আরো পড়ুন : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিভিতে মিথ্যা তথ্যের কারণে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগপত্র অনুমোদন

Share The News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *