পরিবারের অভাব ঘোচাতে ঢাকায় এসেছিলেন লিজা আক্তার। বাইশ বছরের এই তরুণী গৃহকর্মীর কাজ করতেন। তার বাবা জয়নাল কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। বাবার কষ্ট দেখে লিজা ও তার ভাই কয়েক বছর আগে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসেন। তারা কাজ করে বাবা-মাকে টাকা পাঠাতেন। বাবা-মায়ের কষ্টও অনেকটা লাঘব হয়েছিল। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন গড়ায়নি। ২০২৪-এর ১৮ই জুলাই শান্তিনগরে একটি ১৪ তলা ভবনের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। লিজার পেটের সামনে থেকে গুলি লেগে পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। তার মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে পরিবারটি। সন্তানের জন্য এখনো রাত-দিন কাঁদেন বাবা-মা। ভুলতে পারছে না লিজার স্মৃতিগুলো।
শহীদ লিজা আক্তারের ভাই মো. রাকিব বলেন, এখনো শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটা দেয়নি। আমরা সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে আছি। ২২শে জুলাই আমার বোন মারা যাওয়ার এক বছর পূর্ণ হবে। আমরা যদি বোন হত্যার দৃশ্যমান বিচারটি পেতাম তাহলে নিজেদের মন একটু হলেও শান্তি পেতাম। এত বড় একটা গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন দেশে সবার উচিত ছিল যারা শহীদ বা আহত হয়েছেন তাদের নিয়ে ভাবা। সবাই রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। যারা স্বজন হারিয়েছে তারা ছাড়া এই কষ্ট কেউ বুঝবে না।
তিনি বলেন, আমার বাবা-মা গ্রামের বাড়ি ভোলাতে থাকে। তারা তাদের মেয়ের মৃত্যুটা এখনো মেনে নিতে পারছে না। সব সময় লিজাকে নিয়ে ভাবে। একেবারে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। কিছু নগদ অর্থ পেয়েছি সেটি বাবা-মায়ের পেছনে খরচ করা হচ্ছে তাদের চিকিৎসার জন্য। লিজাকে হারিয়ে তারা বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে। বাবা আগে কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। লিজা বেঁচে থাকতেও কাজ করেছে কিন্তু ও মারা যাওয়ার পর একবারে দুজনই ভেঙে পড়েছে। সংসারে অভাবের কারণে অল্প বয়সে আমি আর লিজা কাজের সন্ধানে ঢাকা চলে আসি। দু’জনে কাজ করে বাড়িতে বাবা-মাকে টাকা পাঠাতাম। তখন আমাদের পরিবারটা খুব ভালো ছিল, আর এখন আমিও ঢাকাতে নেই আর লিজা তো দুনিয়াতেই নেই। বাবা-মায়ের অসুস্থতায় তাদের পাশে থাকতে হচ্ছে। আমরা পাঁচ বোন, দুই ভাই। লিজা ছিল বোনের মধ্যে ছোট। বাবার বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। ঢাকায় এসে লিজা গৃহকর্মীর কাজ করতো পাশাপাশি আরবি পড়তো। আর মাত্র তিন মাস বাকি ছিল হাফেজি শেষ করতে। মারা যাওয়ার একসপ্তাহ আগে তার বিয়ের জন্য বলেছিলাম আমি। তখন সে বলেছিল, ‘ভাইয়া আর তিন মাস আছে পড়াটা শেষ করি’। এত অল্প বয়সে বোনটা মারা যাবে বুঝতে পারিনি।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রাকিব বলেন, ১৮ই জুলাই আনুমানিক পাঁচটার দিকে আমার কাছে লিজা গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর আসে। তখন সে থাকতো ঢাকার শান্তিনগরে আর আমি ছিলাম বসুন্ধরা আবাসিকের দিকে। সে সময় আমি কোনোভাবে বের হতে পারিনি; রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ খারাপ ছিল। পরের দিনও আমি বের হতে পারিনি বাইরে। ২১শে জুলাই অনেক কষ্ট করে হেঁটে হাসপাতালের দিকে যাই। লিজার বান্ধবী ও যে বাসায় থাকতো তারা হাসপাতালে নিয়েছিল। সেখানে গিয়ে দেখি লিজার অবস্থা বেশি ভালো না। এরপর তার অবস্থা খারাপ দেখে পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যাই; সেখানে নেয়ার পরে একটা সার্জারি হয়। পরে ২২শে জুলাই মারা যায়। পরে লিজার মরদেহ নিয়ে গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তার পেটের সামনে থেকে গুলি লেগে পেছন দিক থেকে বেরিয়ে যায়। ঘটনার সময় লিজা ১৪ তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। বোনের স্মৃতিচারণ করে রাকিব বলেন, লিজার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছি; এখনো আমার বিশ্বাস হয় না লিজা মারা গেছে। বছর ঘুরলেও মনকে আমরা কিছুতেই সান্ত্বনা দিতে পারছি না। সেদিন আমার হাতের উপরে বোনটা মারা যায়। এখন সবসময় ওই দৃশ্য চোখে ভাসে। ওর সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। আমি ঢাকায় কনস্ট্রাকশনের কাজ করতাম। বোন মারা যাওয়ার পর আমিও ঢাকা থেকে চলে এসেছি। ঢাকায় একা থাকলে আরও দম বন্ধ লাগে; এজন্য বাবা-মায়ের কাছে চলে এসেছি। আমার ছোট ছিল লিজা। ওর যেকোনো কথা আমার সঙ্গে বলতো। আমরা ভাই-বোন থাকলেও আমাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। সবসময় মনে হয় বাবা-মায়ের চেয়ে আমার বেশি খারাপ লাগছে। ছোটবেলা থেকে দুষ্টমি করতে করতে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি। ২২শে জুলাই বোনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদের ব্যবস্থা করবো। বাবা-মা সবসময় কাঁদতে থাকে আর বলে, আমাদের ভালো রাখতে গিয়ে আজ আমার মেয়ে জীবন দিয়েছে। তার টাকা দিয়েই বাবা-মায়ের খরচ চলতো আর আমার টাকায় সংসারের অন্যান্য খরচ চালাতাম। তিনি বলেন, লিজা শুধু পরিবারের দিকে তাকিয়ে ঢাকায় এসেছিল। প্রায় ৫-৬ বছর ধরে ঢাকায় থাকতো। খুব অল্প বয়সে চিন্তা ছিল কীভাবে বাবা-মায়ের দুঃখ ঘোচাবে। লিজার ইচ্ছা ছিল বাবা-মাকে নিয়ে ওমরাহ করতে যাবে। এখন আমি চিন্তা করেছি ভাই হিসেবে ওর যে ইচ্ছাটা ছিল সেটি আমি পূরণ করবো তবুও তো আমার বোনের ইচ্ছাটা পূরণ হবে।
আরো পড়ুন : সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কমে যাচ্ছে মা-সন্তানের যোগাযোগ
