নিজস্ব প্রতিবেদক : বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আবারও দেশবিদেশে ষড়যন্ত্র চলছে। তবে কোনো ষড়যন্ত্রই দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে নিয়ে আমরা সব ষড়যন্ত্রের জবাব দেব। এজন্য সব মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গতকাল বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির বিশাল বর্ণাঢ্য র্যালিপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এ আহ্বান জানান। সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নিজে স্লোগান ধরে বলেন-দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’
র্যালি শুরুর অনেক আগেই সকাল থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমবেত হতে শুরু করেন। হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতিতে কাকরাইল মোড় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নেতা-কর্মীদের হাতে শোভা পায় বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আলোকচিত্রসংবলিত প্ল্যাকার্ড। বিভিন্ন রঙের ক্যাপ ও গেঞ্জি পরিধান করে নেতা-কর্মীরা র্যালিকে আরও বর্ণাঢ্য করে তোলেন। সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সোয়া ৩টায় নয়াপল্টন থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়। র্যালিটি প্রধান বিচারপতির বাসভবন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে দিয়ে বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে শেষ হয় বিকাল সাড়ে ৪টায়। তারেক রহমান নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নয়াপল্টন থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ কিলোমিটার পথ হাঁটেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু দেশের ভিতরেই নয়, বাইরেও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সীমান্তের ওপার থেকেও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ষড়যন্ত্র দেশের ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক, আমরা এক এক করে সব ষড়যন্ত্রের জবাব দেব।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। পতিত স্বৈরাচার ও তাদের দোসররা এখনো ষড়যন্ত্রে মেতে আছে। আবারও তারা দেশে গুমখুনের রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে চায়। এ ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে।’ সরকারপ্রধান বলেন, ‘যে দেশের মানুষ ’৭১, ’৭৫, ’৯০, ’২৪ ঘটাতে পারে, সে দেশের মানুষকে ষড়যন্ত্র করে দাবিয়ে রাখা যাবে না।’ নয়াপল্টনে সমবেত নেতা-কর্মী ও জনতার কাছে সমর্থন চেয়ে প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা কি আমাদের সঙ্গে আছেন? এ সময় নেতা-কর্মী-সমর্থকরা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানান।
বিকাল ৩টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ট্রাকের ওপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। নেতা-কর্মী-সমর্থকসহ দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭ নভেম্বর হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের দিন, ৭ নভেম্বর হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন, ৭ নভেম্বর হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের দিন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা শুধু স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ফিরিয়েই আনেনি। দেশের মানুষ স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্রকারীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। যেভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একইভাবে সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছে দেশের মানুষের অংশগ্রহণে, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতের মতো এখনো একটি পক্ষ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আবারও তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে চায়, আবার তারা আমি-ডামি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়। এ সুযোগ আর দেওয়া হবে না।’
সভায় সভাপতির বক্তৃতায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে কবিতা আবৃত্তি করেন। তিনি ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বকীয়তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল স্তম্ভ বা ‘ম্যাগনাকার্টা’ হিসেবে অভিহিত করেন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং চলমান রাষ্ট্র পুনর্গঠনে নেতা-কর্মীদের সুসংগঠিত থাকার আহ্বান জানান।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বিরোধী দলকে গঠনমূলক সমালোচনা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এখন যা করছে বিরোধী দল, তা গঠনমূলক কর্মসূচি নয়।’
অর্থমন্ত্রী ও দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বক্তৃতায় সবাইকে চোখ-কান খোলা রাখার আহ্বান জানান। তিনি জাতীয় সংহতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতির ধারা গতিশীল এবং ভোটাধিকারভিত্তিক একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুসংহত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার তাগিদ দেন এবং যেকোনো বিশৃঙ্খলা কঠোরভাবে প্রতিহত করার ঘোষণা দেন।
এ ছাড়া র্যালিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সমাজকল্যাণ ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমান ও ফরহাদ হালিম ডোনার, ভাইস চেয়ারম্যান ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, কোষাধ্যক্ষ ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রচার সম্পাদক এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন প্রমুখ।
উদ্বোধনী বক্তব্য শেষ করে প্রধানমন্ত্রী পায়ে হেঁটে র্যালিতে যোগ দেন। এ সময় তিনি হাত উঁচিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। বিকাল সাড়ে ৪টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পৌঁছে ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত সমাপনী বক্তব্য দেন তারেক রহমান।
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর থেকে যে মহল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত জনগণ তাদের পরাজিত করেছে। আবারও তারা ষড়যন্ত্র নিয়ে মাথা চাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাই আসুন জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই-যেকোনো মূল্যে আমরা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করব। এটাই হোক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রতিজ্ঞা। যত দিন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন এই বিপ্লবের র্যালি চলমান থাকবে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘একাত্তরের মতো, নব্বইয়ের মতো, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের মতো আবারও দাঁতভাঙা জবাব আমরা দিতে চাই। আজকে ৭ নভেম্বরের সার্বভৌমত্ব র্যালি হোক আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দিন। আজকের এই র্যালি হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার দিন।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটি হোক গণতন্ত্র রক্ষার দিন।’
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ র্যালিতে সকাল থেকেই স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নয়াপল্টন ও আশপাশ এলাকা। নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে র্যালিটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বর্ণাঢ্য র্যালিতে পাঁচটি ঘোড়ার গাড়ি, একটি হাতি, ব্যানার-ফেস্টুনসহ বিশাল মিছিল নিয়ে আসে মহানগরী উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দল। র্যালিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ কেন্দ্র করে নয়াপল্টনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সেখানে এসআরবি, পিজিআর, পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), বিভিন্ন সংস্থা ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। র্যালি কেন্দ্র করে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বিএনপি কার্যালয়ের সামনের সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা : জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে গিয়ে সমাধিস্থলে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। পরে তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনায় ফাতিহা পাঠ ও মোনাজাতে অংশ নেন।
এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, মহিলা দল সভাপতি আফরোজা আব্বাসসহ যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।
আরো পড়ুন : ৮ নভেম্বর, আজকের দিনে জন্ম-মৃত্যুসহ যত ঘটনার
